খেলাধূলা

সেই ডারউইনেই ইতিহাসগড়া প্রতিশোধ বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়াজয়

সকলেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন। স্বীকৃত ব্যাটসম্যান হিসেবে লড়াইটা চালিয়ে নিচ্ছিলেন আল শাহরিয়ার বিদ্যুৎ। স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের একটি গুগলি সামাল দিতে গিয়ে হড়বড় করে ফেলেন বাংলাদেশের এই টপ অর্ডার। ক্রস ব্যাট চালাতে গিয়ে এজড হয়ে মিড উইকেটে উঠে পড়ে বল। তড়িৎ দৌড়ে গিয়ে সেটি লুফে নেন বোলার নিজেই। শেষ হয় লড়াই। মাথা হেট করে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। না, এক রত্তিও ভুল পড়ছেন না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর আগে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের টেস্ট খেলার চিত্রটা ছিল এমনই। খোদ অজিরাও তাদের মাটিতে এবারও এই বাংলাদেশকেই আশা করেছি। তা না হলে ‘তিন দিনেই টেস্ট শেষ’ বলা দেশটির মিডিয়া আর খোদ দলটির অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও কি টিপ্পনি করতে সাহস পান!

তবে তার জবাবে ম্যাচটি শুরু হবার আগেই বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ‘২৩ বছর আগের সেই বাংলাদেশ আর এই বাংলাদেশ এক নয়’ বলে কয়ে জেতার মাহাত্ম্য কোথায়? হ্যাঁ, বাংলাদেশ জিতেছে। বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জিতেছে। বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই টেস্টে হারিয়ে নিয়েছে মধুর প্রতিশোধ। এবং সেটিও সেই ডারউইনের মাটিতে। পার্থক্য শুধু একটাই, ২০০৩ সালের জুলাইয়ের সেই ম্যাচটি অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল তিন দিনে, এই আগস্টে বাংলাদেশ জিতেছে সাড়ে তিন দিনে। গতকাল দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথমটি বাংলাদেশ জিতেছে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।

প্রায় দুই যুগ আগে খালেদ মাহমুদ সুজনের সঙ্গে ম্যাচজয়ী উইকেট বগলদাবা করে করমর্দন কারী স্টিভ ওয়াহ এবার দেখেছেন উল্টো চিত্র। ব্যু ওয়েবস্টারের বলে ইতিহাসগড়া বাউন্ডারি হাঁকানো মুমিনুল হকের সঙ্গে পানসে মুখে হাত মেলাচ্ছেন সেঞ্চুরিয়ান ক্যামেরন গ্রিন। দেখেছেন বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়ানো অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমের বুনো উল্লাস, গোটা ডাগ আউটে বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের একে অপরের সঙ্গে হাই-ফাইভ, বিরল চিত্র কোচ ফিল সিমন্সের চওড়া হাসির সঙ্গে অধিনায়ক শান্তকে বুকে জড়িয়ে নেয়া। আর ডারউইনের মতো ছোট্ট শহরের স্টেডিয়ামেও বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকায় বিশ্বাস করা হাজারো দর্শকের হর্ষধ্বনী। এসবই বলে দেয় এই জয়ের মাহাত্ম্য। কেননা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে ৯ উইকেটের এই জয় কতটা বড়, সেটি বোঝা যায় ইতিহাসের দিকে তাকালেই। শ্রীলঙ্কা অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে কোনো দিন টেস্টে হারাতে পারেনি। পাকিস্তান সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারিয়েছিল। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে এই শতকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে শুধু ভারত। সেই তালিকায় এবার যোগ হলো বাংলাদেশের নাম।

History

বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দুই যুগের পরিসংখ্যান আর গত সাড়ে তিন বছরের চিত্রের দিকে তাকালেই এই পরিবর্তনের পরিষ্কার রূপরেখা মেলে। টেস্ট মর্যাদার প্রথম ২০ বছরে ১১৯টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশের জয় ছিল মাত্র ১৪টিতে। যেখানে আনন্দের চেয়ে বেদনা আর বিব্রত হওয়ার স্মৃতিই অনেক বেশি। অথচ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৪১ টেস্টের মধ্যে এসেছে ১৩ জয়। আরও সাম্প্রতিক হিসাব বললে, গত সাড়ে তিন বছরে ২৪ টেস্টের ১২টিতেই শেষ হাসি হেসেছে বাংলাদেশ। আর এই পথচলাতেই যুক্ত হলো অস্ট্রেলিয়ার মাঠে তাদেরকেই হারিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক কীর্তি- যাকে বিনাতর্কে অর্জনের বিচারে সবার ওপরে রাখবেন যে কেউ। যেমনটা রাখছেন অধিনায়ক শান্তও।

বাংলাদেশ অবশ্য ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডকে তাদের মাটিতে টেস্টে হারিয়েছিল। কঠিন কন্ডিশনে পাওয়া সেই জয়ও ছিল ঐতিহাসিক। এরপরও ক্রিকেট-বিশ্বে অস্ট্রেলিয়া তো অস্ট্রেলিয়াই! শান্তও হয়তো এসব বিবেচনায় এটাকেই দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় জয় হিসেবে দেখছেন, ‘এটাই এখন পর্যন্ত যেকোনো সংস্করণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। আমরা ভবিষ্যতে আরও বিশেষ কিছু করতে চাই।’ এমন জয়ে বাংলাদেশ খেলেছে দল হিসেবে। অধিনায়খ নিজেও নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে খেলেন ৮৪ রানের ইনিংস। পুরো ম্যাচে দারুণ নেতৃত্ব দিয়ে ধারাভাষ্যকক্ষে থাকা রিকি পন্টিং, ডেভিড ওয়ার্নারদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। শান্ত তাই নিজের পারফরম্যান্সেও গর্বিত, ‘এই জয়ে দারুণ খুশি। নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে গর্বিত এবং ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তাতেও গর্বিত। আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি।’

এমন একটি জয়ের পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা মাঠে থাকতেই তাঁদের ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের ম্যানেজার নাফিস ইকবালের ফোনে ভিডিও কলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কী কথা হয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে সেটিও জানিয়েছেন শান্ত, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। আমাদের শরীরের কী অবস্থা, ওটারও খোঁজখবর রেখেছেন যে আমরা ভালো আছি কি না।’ প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আরও অভিনন্দন পেয়েছেন ক্রিকেটাররা। অধিনায়ক বলেছেন, ‘আমাদের বোর্ড সভাপতি ফোন করেছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন, উনি অনেক খুশি। পাশাপাশি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ফোন করেছিলেন, উনার সঙ্গে কথা হয়েছে। অভিনন্দন জানিয়েছেন। ’ জয়ের মুহূর্তটা যে বিশেষ, সেটিও বলেছেন নাজমুল, ‘আমাদের এখানে এই মোমেন্টগুলো স্পেশাল ছিল, ভালো লেগেছে ও আমি খুশি যে সবাই আমাদের এই জয়টা উপভোগ করছেন এবং আমি মনে করি যে দেশের মানুষ অনেক খুশি।’
এই খুশি বেড়ে যাবে বহুগুণে যখন ম্যাকাইয়ে ২২ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের জয়ের হাসি হাসে বাংলাদেশ।

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১