মরক্কো আবারও বিশ্বকাপে রূপকথার যাত্রা অব্যহত রেখেছে— যদিও কানাডার বিপক্ষে তাদের সর্বশেষ জয়টা সৌন্দর্যের চেয়ে শক্তির প্রদর্শনীই ছিল বেশি। হিউস্টনে শনিবার বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে মরক্কো। ম্যাচে তারা মাত্র পাঁচবার গোলের চেষ্টা করেছে—বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট ম্যাচে জয়ী দলের মধ্যে যা সবচেয়ে কম। প্রথমার্ধে তারা ইতিহাস গড়ে আরও একটি—গোলের উদ্দেশে শটের (১) চেয়ে বেশি হলুদ কার্ড!
তবুও মরক্কো জিতেছে। যেমনটা বলা হয়, বড় দল জানে কীভাবে “কুৎসিত ফুটবল” খেলেও জয় তুলে নিতে হয়। এখন মরক্কোকে শুধু বড় দল নয়, শিরোপার প্রকৃত দাবিদার হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
মরক্কো কেবল এই বিশ্বকাপেই অপরাজিত নয়, বরং সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৪ ম্যাচে হারেনি আফ্রিকার চ্যাম্পিয়নরা।
.
এই রেকর্ডে যদিও ২০২৬ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ফাইনালের বিতর্কিত ফলাফলও রয়েছে (সেনেগালের বিপক্ষে জয়, যা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে)। তবুও তাদের এই ধারাবাহিকতা বিস্ময়কর।

তাদের সবশেষ হার ছিল গত বছরের অগাস্টে আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপে, কেনিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলে।
কানাডার বিপক্ষে মরক্কো প্রথম ২০ মিনিট কোনো আক্রমণই শানাতে পারেনি। প্রথম ১৫ মিনিটে কানাডার দুটি সুযোগ আসে, কিন্তু জোনাথন ডেভিড ও তানি ওলুওয়াসেইয়ের শট রুখে দেন গোলরক্ষক বোনো।
মরক্কো টানা দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম কোয়ার্টার ঘন্টায় প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শ করতে পারেনি। তবে একবার ছন্দে আসার পর তারা পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
কানাডা কোচ জেসি মার্শ বলেন, “তারা কিছুটা চাপে ছিল, কিন্তু ভাঙেনি।”

মরক্কো কি সত্যিই বিশ্বকাপে শিরোপার দাবিদার?
কানাডার বিপক্ষে তাদের জয় আবারও এই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
কানাডার তারকা আলফোনসো ডেভিস ইনজুরিতে বেঞ্চে বসে ছিলেন। মরক্কো মাঝমাঠে স্টিফেন ইউস্তাকিওকে নিষ্ক্রিয় করে দেন এবং স্ট্রাইকার জোনাথন ডেভিডকে খেলায় প্রভাব ফেলতে দেয়নি।
অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি সবসময়ই বিপজ্জনক ছিলেন—বল নিয়ে যেমন, তেমনি প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতেও। ব্রাহিম দিয়াজ দুটি অ্যাসিস্ট করেন, বিশ্বকাপে তার মোট অ্যাসিস্ট এখন চারটি—যা আফ্রিকান খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মরক্কো কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, “প্রথমার্ধ ছিল খুবই ভয়াবহ। বিরতিতে কিছু পরিবর্তন দরকার ছিল। চাপ থেকে আমরা কখনোই নিরাপদ ছিলাম না। তবে আমরা আমাদের পরিচয় বদলাইনি, খেলার দর্শন বদলাইনি। কঠিন মুহূর্ত আসবেই, তখন আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে।”

এ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ছেলেদের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল মরক্কো। তারা এখন পর্যন্ত চারটি নকআউট ম্যাচ জিতেছে—২০২২-এ দুইটি, ২০২৬-এ দুইটি—যা অন্য সব আফ্রিকান দেশের সম্মিলিত জয়ের সমান।
আরেকটি জয় পেলে তারা টানা দ্বিতীয়বার সেমিফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব অর্জন করবে।
ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়, হাইতির বিপক্ষে গোল উৎসব—তাদের পারফরম্যান্সে বৈচিত্র্য আছে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের হেডে বাঁচে মরক্কো। কানাডার বিপক্ষে জয় ছিল সহজ, কিন্তু মানসম্মত নয়।
বিশ্লেষক ক্রিস সাটন বলেন, “মরক্কো প্রথমার্ধে দুর্বল ছিল। যদি ফ্রান্সের বিপক্ষে এমন খেলে, তারা ভেঙে পড়বে।”

মরক্কোর সাফল্য হঠাৎ আসেনি। রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠের উদ্যোগে ২০০৯ ও ২০১৯ সালে একাডেমি ও ৬৫ মিলিয়ন ডলারের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এর ফলে তারা আফ্রিকার শীর্ষ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের (যেমন হাকিমি ও দিয়াজ) দলে টানতে পেরেছে।
ওয়াহবি বলেন, “আজ মরক্কোকে সবাই প্রকৃত দাবিদার হিসেবে দেখে। এটা কেবল শুরু।”
কাতারে বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা ছিল বিস্ময়কর, কিন্তু উত্তর আমেরিকায় তা লক্ষ্যভিত্তিক। মরক্কো এখন আর চমক নয়—বরং আফ্রিকার প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ তাদের সামনে।










Add Comment