ধর্মীয় আচারণ

বিতর্কিত লিংকনকে প্রতিমন্ত্রী করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে সরকার : বিভিন্ন মহলে প্রতিবাদের ঝড়

গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেশের আলেম-উলামা, পীর মাশায়েখ সর্বস্তরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও আকিদাগত ঐতিহ্যের কথা বিবেচনা না করে এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে সরব প্রতিবাদ জানাচ্ছে সর্বস্তরের তাওহীদী জনতা।

সামাজিক মাধ্যমে ও বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে, নবনিযুক্ত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ‘আহলে হাদিস’ বা সালাফি মতাদর্শের একজন উগ্রপন্থী ব্যক্তি। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও হানাফি মাজহাবের অনুসারী। হানাফি আকিদা ও বিশ্বাসের সঙ্গে আহলে হাদিস মতাদর্শের মৌলিক সাংঘর্ষিক পার্থক্য বিদ্যমান। ফলে এমন একজন ব্যক্তিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংবেদনশীল পদে বসানোকে দেশের সিংহভাগ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন আলেম-ওলামারা। পীর মাশায়েখ আলেম ওলামা ও বিভিন্ন মহলের মাঝে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। লিংকনকে প্রতিমন্ত্রী করার প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারের কাছে তার নিয়োগ পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে নেতৃবৃন্দ। লিংকনকে প্রতিমন্ত্রী করার প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারের কাছে নিয়োগ পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, ছারছীনা দরবার শরীফ, সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত এবং খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশ। পাশাপাশি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ও আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুরসহ শীর্ষ আলেমরা এই সিদ্ধান্তকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কওমি ও সুফিবাদী ঘরানার অবদান উপেক্ষা করে ধর্মীয় সংবেদনশীল পদে বিতর্কিত ব্যক্তিকে বসানো আত্মঘাতী; প্রয়োজনে কওমি আলেমদের মধ্য থেকে অন্য কাউকে এই দায়িত্ব প্রদান করে উলামায়ে কেরামের আস্থা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা উচিত।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আহলে হাদীস মতাদর্শের শামীম কায়সার লিংকনকে দায়িত্ব দেওয়ায় গভীর অসন্তোষ, উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশের আমীর ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমীর আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর। শুক্রবার রাতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামীম কায়সার লিংকনের শপথ গ্রহণের পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এমন একজন ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হয়েছে, যার ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে দেশের আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের উদ্বেগ ও মতপার্থক্য রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তিকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় আমরা গভীরভাবে অসন্তুষ্ট ও উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয় দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আলেম-উলামা ও কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পদে এমন ব্যক্তিকে রাখা উচিত, যিনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের আকিদা-বিশ্বাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর বলেন, আমরা কোনো ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না; কিন্ত ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর একটি জায়গায় দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান ও দেশের বৃহত্তর ধর্মীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই নিয়োগ দেশের আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে, সরকারকে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণে দেশের বিজ্ঞ আলেম-উলামা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত ধর্মীয় অঙ্গনে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামীম কায়সার লিংকনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান এবং সরকারের প্রতি এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশের আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ জনগণের উদ্বেগের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এদিকে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সভাপতি এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হযরত মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এক বিবৃতিতে বলেন, বিতর্কিত শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করে বর্তমান সরকার দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হেনেছে। তিনি আরো বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করেছে যে, তারা দেশের সাধারণ জনগণের মনের ভাষা ও আকাঙ্খা বুঝতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশ। এদেশে দীর্ঘদিন ধরে খালেছ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং হানাফি মাযহাবের অনুসারী আলেম-ওলামা ও স্কলারগণ সঠিক দ্বীনের প্রচার-প্রসার করে আসছেন। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হানাফি মাযহাব ও সহীহ দ্বীনের অনুসারী। অথচ এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করে গুটি কয়েক লোকের একটি ভ্রান্ত মতবাদের প্রচারককে ধর্মীয় মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্বে বসানো হয়েছে। বিবৃতিতে আলেম সমাজকে অবজ্ঞার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, আলেম-ওলামারা এ ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পূর্বেও সরকারকে একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন। কিন্ত সরকার সেই প্রতিবাদ ও পরামর্শকে চরমভাবে অবজ্ঞা করেছে। এই ধরনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে। অবিলম্বে এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব বলেন, “আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিতর্কিত মন্ত্রিত্ব বাতিল করে একজন যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও সঠিক দ্বীনের অনুসারীকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, আলেম-ওলামাদের দাবি মানা না হলে এবং বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বিগত দিনে যেভাবে আলেম সমাজ সরকারের পাশে থেকে সহযোগিতা করেছিল, আগামীতে সেই সহযোগিতার হাত তারা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
নেটিজেন ও ইসলামী বক্তাদের মতে, যেখানে বিএনপির সরকার গঠনে ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’সহ হানাফি ঘরানার বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের অসামান্য অবদান রয়েছে, সেখানে তাদের মতামতকে তোয়াক্কা না করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অনভিপ্রেত। প্রয়োজনে অনির্বাচিত বা কওমি অঙ্গনের গ্রহণযোগ্য কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়ার জোর দাবি উঠেছে। মুফতি রেজাউল করিম আবরার এক সভায় তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আপনারা ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছেন। আমি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বানানো নিয়ে সমালোচনা করছি না, তিনি একজন কঠোর লামাজহাবী। তাকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বানানোয় সমস্যা নাই, কিন্ত যদি আমাদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোনো বইয়ে অথবা আমাদের দেশে আবহমান কাল থেকে, হাজার বছর থেকে যে নামাজ ও ইবাদত চলে আসছে এগুলা যদি পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন, প্রধানমন্ত্রী আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, জাতীয় মসজিদে সবার আগে জাতীয়ভাবে বাহাস হবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের নামাজ ও ইবাদতকে জাল প্রমাণ করার অধিকার কারও নেই। হাজার বছরের প্রচলিত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ওপর আঘাত হানলে বায়তুল মোকাররমে বাহাসের মাধ্যমে সমাধান হবে। শফিকুল ইসলাম প্রধান নামে একজন সামাজিক মাধ্যমে এক জরিপের আহ্বান জানিয়ে লেখেন, জরিপে অংশগ্রহণ করুন ১. লিংকন নামটিই বিধর্মী নাম, ২. সে কট্টরপন্থী সালাফি লোক, ৩. বাংলাদেশে সালাফির সংখ্যা ৪-৫%।” উক্ত জরিপে অধিকাংশ ব্যবহারকারীই লিংকনের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হওয়ার বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন। আব্দুল্লাহ যোবায়ের নামে অপর এক ব্যবহারকারী আক্ষেপ প্রকাশ করে লেখেন, “(লিংকন হচ্ছে) আকরামুজ্জামান স্বীকৃত গোস্তাখে রাসুল। সবচেয়ে খতরনাক আহলে হাদিস শায়খদের একজন সে। কোনো দুষ্ট লোক যদি কারও প্রশংসা করে, আমি স্বভাবতই তার নিন্দা করি। অতএব এই আহলে হাদিস লিঙ্কনের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগদানের নিন্দা জানিয়ে রাখলাম।” প্রতিবাদের অংশ হিসেবে গাজী শাহাদাত হোসেন নামে এক ব্যবহারকারী সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, “ইসলাম থেকে পথভ্রষ্ট উগ্রবাদী সালাফি ধর্মের অনুসারী লিংকন’কে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৮০% জনমত হারালেন। একজন লা মাজহাবি ব্যক্তি শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছেন বাংলাদেশ বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব মাওলানা এম এ মতিন ও প্রিন্সিপাল স উ আব্দুস সামাদ। দপ্তর সচিব মুহাম্মদ আব্দুল হাকিমের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর বিশাল সুন্নী কমিউনিটিকে উপেক্ষা করে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দেশের জন্য অশনিসংকেত। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী যাকে করা হয়েছে তিনি একজন কট্টোর লা-মাযহাবি এবং বিতর্কিত মতাদর্শ আহলে হাদীসের অনুসারী।

নেতৃদ্বয় আরও বলেন, একজন লা মাজহাবি ব্যক্তিকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে সরকার আত্মঘাতী সীদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসলামের মূল দর্শনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক হতে হবে। শামীম কায়সার লিংকনকে এ দায়িত্ব দেওয়া মোটেই ঠিক হয়নি। শামীম কায়সার লিংকনের ব্যাপারে ইসলামের মৌলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কিত কর্মকান্ড এর প্রমাণ রয়েছে। নেতৃদ্বয় অবিলম্বে বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের নিকট উদাত্ত আহবান জানান। না হয় এদেশে মূল শক্তি সুফিবাদী সুন্নী মুসলিমরা কঠিন কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 ১২৩
৪৫৭৮৯১০
১১১১৩৪১৫১৬১
৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৯৩০৩১