Templates by BIGtheme NET

মানবাধিকার ও ইসলাম

ড. মো: মোজাহেদুল ইসলাম মুজাহিদ

সারা বিশ্বেই মানবতা ও মানবাধিকার আজ হুমকির মুখে। সবখানেই অধিকার লঙ্ঘনের মহোৎসব, এক অরাজক পরিস্থিতি। স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণের অধিকার হারিয়েছে মানুষ। নেই খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার। পরিকল্পিতভাবে চালানো হচ্ছে গণহত্যা। নির্বিচারে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে লাখ লাখ নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে।

চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যায় যুদ্ধ। ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ। এককথায়, এক খণ্ড নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে পৃথিবী। শুধু ক্ষমতার লোভে বিশ্বজুড়ে ধ্বংসলীলায় মেতেছে বিশ্বের রাজনীতিকরা। একদিকে মানবতার বুলি আওড়াচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ হত্যার তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার হরণ করছে ‘মানবতার রক্ষকরা’ই।

দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে ‘বিশ্বমানবতার বিবেক’ জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলো। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা আজ ‘একপ্রস্ত কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয়’। ‘চোখের মাথা খেয়ে’ বসে আছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও। সম্প্রতি শ্রীলংকা গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতির এ চিত্র উঠে এসেছে।

মানবতা ও মানবাধিকারের বিচারে বর্তমান বিশ্ব এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশে দেশে চলছে গণহত্যা আর জাতিগত নিধনযজ্ঞ। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও সংঘবদ্ধ বৌদ্ধ অধিবাসীদের অভিযান এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ও ইয়েমেনে ধুঁকছে মানবতা। ক্ষুধা আর দুর্ভিক্ষের কবলে লাখ লাখ নাগরিক।

কেড়ে নেয়া হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ভূমির অধিকার। একই ভাগ্য বরণ করছে ভারতের কাশ্মীরের অধিবাসীরা। সম্প্রতি এ তালিকায় যোগ হয়েছে চীনের উইঘুর জাতিগোষ্ঠীর নাম। উইঘুরদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পাঁয়তারা করছে বেইজিং। বন্দিশিবিরে বন্দি করা হয়েছে ১০ লাখের বেশি উইঘুরকে।

এক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের একটার পর একটা দেশে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে অবৈধ যুদ্ধ। এসব এ যুদ্ধে মারা গেছে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ। হত্যা, ধ্বংস আর জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে বিভিন্ন অঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। কিন্তু নির্যাতিত ও নিপীড়িত এসব মানুষকে রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর, তারাই আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে ‘মানবাধিকার’ ধারণাটি সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। চীন থেকে পেরু, আইসল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া তথা দেশ হতে দেশ পেরিয়ে সারা বিশ্বে মানবাধিকারের স্লোগান সরবে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ভক্ষকরাই এর রক্ষক হওয়ার এবং পথভ্রষ্টরা পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ভান করছে। মানবাধিকার আইনের ইতিহাস সুদীর্ঘ হলেও বিশ্বে মানবাধিকার এখনও তার সঠিক স্থান লাভ করতে পারেনি। কারণ মানবজাতি শতাব্দীকাল হতে ‘মানবাধিকার’ শব্দটির সুযোগ নিয়ে এর অপব্যবহার করেছে। প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বে মানবাধিকারের ডংকা বাজানোর এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এই ডংকা বাজানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘ এবং এর সর্ব্বোচ্চ শক্তিশালী অঙ্গ ‘নিরাপত্তা পরিষদ’কেও নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার করা হচ্ছে। মানবাধিকারের ছদ্মবেশ যেন শতাব্দীর উৎকৃষ্ট ছদ্মবেশে পরিণত হয়েছে।

islam-manobadikar
.

ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকারের ধারণা :
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকারের ধারণাটি আল্লাহ প্রদত্ত। পশ্চিমা ও সমসাময়িক মানবাধিকার ধারণার মত ইসলামে মানবাধিকার কোন মানব-চিন্তাপ্রসূত কনসেপ্ট নয়। মানুষের জন্মলগ্ন থেকে সঠিক ও বাধ্যবাধকতা সম্বলিত নির্দেশাবলী মানবজাতির নিকট প্রেরিত হয়েছে। একারণে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম মানব প্রেরণের ঘটনা ছিল একটি ঐশ্বরিক পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনা, সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কুরআন প্রেরণের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। ইসলামে মানবাধিকারের মূল উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন মুসলিম উম্মাহর সংবিধান যা মানবাধিকারকে সুনিশ্চিত করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং যোগ্যতা ও সুযোগের অসমতার কারণে মানুষের মধ্যে কেউ শাসিত, কেউ ধনী, কেউ গরীব হতে পারে কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়া এবং সকল ব্যাপারে সুবিচার লাভ করা তার অলংঘনীয় অধিকার। আর ইসলামী ব্যবস্থাতেই মানুষের এই অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। ইসলামী আইনে মানবাধিকার স¤পর্কিত আইনসমূহ রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকার আইন, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইন, দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনসহ সকল আইনই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শাসন কার্যক্রমের একটা মূল বিষয় হলো অধিকার। যেমন- নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রের অধিকার, রাষ্ট্রের উপর নাগরিকদের অধিকার। রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের লোক থাকে, বিদ্রোহীও থাকতে পারে। রাষ্ট্রের উপর তাদের কি অধিকার থাকবে এবং তাদের উপর রাষ্ট্রের কি অধিকার থাকবে, এসবও শাসন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ ও শান্তিকালীন পার¯পরিক কি অধিকার থাকবে তাও রাষ্ট্রের শাসননীতির একটা অংশ। এসব অধিকারের ভিত্তিতেই একটি রাষ্ট্র তার আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করে থাকে। কিন্তু ইসলামের এই অধিকারসমূহ ও আইনের উৎস শাসক বা সরকার নয়। আল্লাহর ওহী আল-কোরআন এবং মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ হলো এসব অধিকার নির্ধারণ ও আইনগত মূলনীতির উৎস।

ইসলামে মানবাধিকারের শ্রেণিবিন্যাস :
ইসলামের বিধান মতে মানবজাতির উপর যে দায়িত্বগুলো অর্পিত হয়েছে সেগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: স্রষ্টার অধিকার বা হাক্কুল্লাহ এবং মানুষের অধিকার বা হাক্কুল ইবাদ। আল্লাহর অধিকারকে জনগণের অধিকাররূপে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। কারণ কুরআন ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ মোতাবেক কর্তব্য পালন মানেই সমাজের কল্যাণ সাধন। উভয় প্রকার অধিকার তথা স্রষ্টার অধিকার ও তাঁর সৃষ্টির অধিকার আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত হয়েছে এবং এ দুই ধরনের অধিকারের জন্য মানুষকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। আবার হাক্কুল ইবাদ -এর অন্তর্ভুক্ত মানবাধিকার দুই ধরনের হতে পারে। প্রথম শ্রেণীতে সেসব অধিকার অন্তর্ভুক্ত যেগুলো পালনে ইসলামী রাষ্ট্র সরাসরি বাধ্য করবে এবং দ্বিতীয় শ্রেণীতে সেসব অধিকার অন্তর্ভুক্ত যেগুলো পালনে রাষ্ট্র সরাসরি বাধ্য করবে না। প্রথম শ্রেণির অধিকারসমূহকে আইনগত অধিকার এবং দ্বিতীয় শ্রেণির অধিকারকে নৈতিক অধিকার রূপে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। দুই-এর মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কারণ তাদের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও জবাবদিহিতা আল্লাহর সাথে স¤পৃক্ত। তাদের মধ্যে একটি মাত্র পার্থক্য হচ্ছে যে, একটির জন্যও ইসলামী রাষ্ট্রের নিকটে জবাবদিহি করতে হবে।

মানবাধিকার ধারণা স¤পর্কে পশ্চিমাদের দাবি :
পশ্চিমারা এটা দাবী করে যে, মানবাধিকারের ধারণাটি বিশ্ববাসীর নিকট তারাই প্রথম উপস্থাপন করেছে। বস্তুতঃ পশ্চিমাদের এটা একটি সহজাত প্রবৃত্তি যে, পৃথিবীতে সকল প্রকার উন্নয়নের একমাত্র দাবী তারাই করবে। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১৭৮৯ সালের ফ্রান্স কর্তৃক মানব ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাকে বর্তমান মানবাধিকারের মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা হলেও আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে ইসলাম মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্যাবলী ঘোষণা করেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপ ও সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তখন তাদের নিকট মৌলিক অধিকারের ধারণা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার তথা একটি মানস¤পন্ন জীবন বিধান ও সর্বোপরি আইনগত সমধিকারের ধারণা ছিল স¤পূর্ণ অজ্ঞাত। কিন্তু এর হাজার বছর আগে মানবতার নবী রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে আরবের মরুপ্রান্তরে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থায়, ঐ সকল অধিকারসমূহ মানুষ স¤পূর্ণরূপে ভোগ করে আসছিল।

জাতিসংঘ বহু পরে ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার নীতি ঘোষণা করে যা ৬১০ সালেই মহানবী (সাঃ) কর্তৃক জাতি, বর্ণ, ধর্ম, গোত্র, নির্বিশেষে সবার জন্য সমান প্রযোজ্য বলে ঘোষিত হয়েছিল। বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি জাতিসংঘ তার একটি সম্মেলনে যুদ্ধবন্দীদের অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করে যা প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে ৬২৪ সালে রাসুল (সাঃ) বদরের যুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের প্রদান করে গেছেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি লক্ষ লক্ষ মানবসন্তানকে আফ্রিকা মহাদেশে শৃঙ্খলিত দাসে পরিণত করছিল এবং খোলাবাজারে পশুর ন্যায় বেচাকেনা করছিল তখন থেকে সহস্র বছর পূর্বে ইসলাম দাসপ্রথার সমপূর্ণ বিলুপ্তি ঘটিয়ে সমাজে তাদের পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা ও অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। অধিকন্তু ইসলামে মানবাধিকারের স্বীকৃতি কোন বানোয়াট বা পোশাকি বিষয় ছিল না। বস্তুতঃ এটা ইসলামী সংবিধানের এবং ইসলামী সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্বরূপ।

পশ্চিমারা যেখানে মানবাধিকার নীতি বাস্তবায়নে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে, সেখানে ইসলামে মানবাধিকার আল কুরআন দ্বারা স্বতঃসিদ্ধ বা সুনিশ্চিত। এর প্রয়োগ জাতি ও ব্যক্তি উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ পটভূমির আলোকে ইসলাম মানবজাতির জন্য যে মানবাধিকারসমূহ সুনিশ্চিত করেছে তা একটু পর্যালোচনা করা যাক। বিশ্ব মানবাধিকার আন্দোলনের সূচনা জাতিসংঘ সনদ (UN Charter), ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা (Magna Carta) কিংবা বিল অব রাইটস ((Bill of Rights)) এর মাধ্যমে হয়েছে এ ধারণা সঠিক নয়। দুনিয়ার কোন অঞ্চলে যখন মৌলিক অধিকার স¤পর্কে মানুষের সচেতনতা একেবারে অংকুরে, ঠিক তখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতিষ্ঠিত মদীনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার পূর্ণভাবে ভোগ করে ধন্য হয়েছিলো মানুষজন। আধুনিক মানবাধিকার পূর্ণাঙ্গরূপ লাভ করা শুরু করে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (United Nation) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কিন্তু এর তেরশত বৎসর পূর্বে অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে মহাবিশ্বের মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম মানবাধিকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেন।

Louis Henkin তাঁর সম্পাদিত The International Bill of Rights বইয়ের ভূমিকাতে উল্লেখ করেছেন, ÒHuman Rights is the idea of our time’’. মানবাধিকার সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের সকল আইনবিদদের ধারণা একই রকম। কিন্তু তাঁদের এই ধারণা সঠিক নয়। পূর্বেই আলোচনা করেছি প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার ধারণাটি বর্তমান যুগের নয়। প্রায় চৌদ্দশত বৎসরেরও আগে পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর মাধ্যমে ইসলামী আইনে মানবাধিকারকে বিধিবদ্ধ করা হয়। ইসলামী আইন সংযোজিত মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের নীতিসমূহই বর্তমান কালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন তাঁর এক ইসলামী গ্রন্থে মানবাধিকারের মৌলিক অধিকারের ইতিহাস টানতে গিয়ে লিখেছেন, পাশ্চাত্যের পণ্ডিতগণ মৌলিক মানবাধিকারের ধারণার বিবর্তনশীল ইতিহাসের সূচনা করেন খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রীস থেকে। অতঃপর খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তার সূত্র যোগ করে এক লাফে খৃষ্টীয় একাদশ শতকে প্রবেশ করেন। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতক পর্যন্তকার পাঁচশো বছরের দীর্ঘকাল তাদের রচিত ইতিহাসের পাতা থেকে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য। তা শেষ পর্যন্ত কেন এমন হল? সম্ভবত এজন্য যে, তা ছিল ইসলামের যুগ।

উদাহরণ স্বরূপ বলতে হয়, ১৮৩৫ সালে মার্কিন মেয়েরা তাদের জন্য প্রথম স্কুলে যাবার সুযোগ পায়। অন্যদিকে ইসলাম ১৪শ’ বছর আগেই মেয়েদের জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে। ১৮৪৮ সালে মার্কিন মেয়েরা স¤পত্তি ভোগের অধিকার লাভ করে। আর ইসলাম তার শুরুতেই পিতা, স্বামী প্রমুখ আÍীয়ের স¤পত্তিতে নারীর অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দেয়। ভোটাধিকারও মার্কিন মেয়েরা পায় মাত্র ১৯২০ সালে। আর মুসলিম মেয়েরা এ রাজনৈতিক অধিকার পেয়েছে পুরুষদের সাথে সাথেই। ওদের আন্তর্জাতিক আইন রচনার ইতিহাস শুরু হয় গ্রীসের নগররাষ্ট্র দিয়ে। তারপর রোমান সভ্যতার বর্ণনা দিয়ে তারা লাফ দিয়ে চলে আসেন আধুনিক যুগে। মাঝখানে ইসলামী সভ্যতার অবদানের কথা তারা ভুলে যান অথবা সেদিক থেকে তারা চোখ বন্ধ রাখেন। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতায় ইসলামের মত আন্তর্জাতিক আইনের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল না। পাশ্চাত্যের এই অন্ধত্বতাড়িত প্রপাগান্ডার কারণেই এবং মুসলিম দেশসমূহে ইসলামের পূর্ণ অনুশীলন না থাকার ফলেই ইসলামের মানবাধিকার ও অন্যান্য বিষয়ে বার বার আমাদের নতুন করে কথা বলার জন্য চেষ্টা করতে হয়।

গ্রীক দার্শনিকগণ আইনের রাজত্ব ও ন্যায়-ইনসাফের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ঠিক। কিন্ত তাদের লেখায় মানবীয় সমতার ধারণা পাওয়া যায় না। তারা মানবজাতিকে হিন্দুস্থানের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ ও শূদ্র ইত্যাদি শ্রেণির ন্যায় বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলেন। প্লেটো তো সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রদানের জন্য গণতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন। তিনি ক্রীতদাসদের স্বাধীন নাগরিকের ন্যায় তিরস্কার করে ছেড়ে না দিয়ে তাদের অপরাধের পৃথক কঠোর শাস্তি দাবী করেন এবং তিনি নারী-পুরুষের মাঝেও সমতার সমর্থক ছিলেন না।
যাহোক, বর্তমান কালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলনের পদযাত্রা শুরু হয়েছে ১২১৫ সালের ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইটস, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস, ১৭০০ সালের এ্যাক্ট অব সেটেলম্যান্ট, ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৭৮৯ সনের ফ্রান্সের ডিক্লারেশন অব রাইটস অব ম্যান এন্ড অব দি সিটিজেন, ১৭৯১ সালের আমেরিকান বিল অব রাইটস কিংবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তী জাতিসংঘ সনদ ও তার আলোকে ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রণীত সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) প্রভৃতির মাধ্যমে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা (সাঃ) উপরে উল্লেখিত ইউরোপীয় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত মানবাধিকারের ধারণাসমূহের বহু পূর্বে অত্যন্ত সু¯পষ্ট ও গোছালোভাবে বিশ্ববাসীর সামনে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা উপস্থাপন করেন এবং তা কাজে পরিণত করেন। মহানবী (সাঃ) মানবাধিকারকে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিস্থাপন করেছিলেন অত্যন্ত সফলতার সাথে যা পশ্চিমা বিশ্ব আজও পারেনি। কেননা আধুনিক বিশ্বেও মানবাধিকারের ধ্বজাধারীদের প্রতিটি কাজ স্ববিরোধিতা ও আÍপ্রবঞ্চনায় ভরপুর। যার উদাহরণ এখানে তুলে ধরার অবকাশ নেই। এ জন্যে আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব মাইকেল এইচ হার্ট বিশ্বের একশত জন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে দি হান্ড্রেডস (The Hundreds) শিরোনামে যে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাতে তিনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে তাঁর মানবতাবাদের জন্য বিশেষ করে বিদায় হজ্বের ভাষণে যে মানবাধিকারের ঘোষণা করেছেন তার জন্য সবার শীর্ষে স্থান দিয়েছেন।

এছাড়া প্রথিতযশা পণ্ডিত Bosworth Smith তাঁর অমর গ্রন্থ, Mohamad and Mohamadanism এ উল্লেখ করেন,

“It recognized individual and public liberty, secured the person and property of the subjects, and fostered the growth of all civic virtues, It communicated all the privileges of the conquering class to those to the conquered who conformed to its religion, and all the protection of citizenship to those who did not. It put an end to old customs that were of immoral and criminal character. It  abolished the inhuman custom  of  burying the infant daughters alive, and took effective measures for the suppression of the  slave traffic; it prohibited  adultery and incestuous  relationship and  on the other hand inculcated purity  to  heart,  cleanliness of  body, and sobriety of life”.

এতে এটা সহজেই অনুধাবনীয় যে, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার উন্নয়নে ইসলাম তথা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অবদান অনস্বীকার্য। আজ থেকে চৌদ্দশত বছরেরও পূর্বে ইসলামে স্বীকৃত মানবাধিকারসমূহ আল্লাহর সর্বশেষ কিতাব কুরআন মজীদ ও সর্বশেষ নবী রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জবানীতে উদাত্ত কন্ঠে বিঘোষিত হয়েছিল। ইসলাম দুনিয়ার মানব রচিত অন্যান্য মতাদর্শের মত মানবাধিকারের শুধু মৌলিক বা কাগুজে ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। সেই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য কার্যকর ভূমিকাও গ্রহণ করেছে।

ইসলামে অধিকারসমূহ বলবৎকরণে দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে আদালতের মাধ্যমে এবং অরেকটি হচ্ছে পরকালে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। একটি হল যদি কোন ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অধিকার বলবৎকরণের জন্য রাষ্ট্রীয় আদালতের মাধ্যমে এবং অপরটি হচ্ছে পরকালে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের ভয় দেখিয়ে নৈতিক মান সৃষ্টি করার মাধ্যমে। যদি কোন ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অধিকার বলবৎকরণের জন্য রাষ্ট্রীয় আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে যে, যদি কোন ব্যক্তি অপরের সঙ্গে প্রতারণা করে এবং অন্যের অধিকার হরণ করে, তাহলে পরকালে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন। ইসলামে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে এ দুটি পদ্ধতি আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পরিলক্ষিত হয় না। ইসলামের মৌলিক মানবাধিকারের ঘোষণা সার্বজনীন, শাশ্বত ও চিরন্তন।

মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞা :
মৌলিক অধিকার হলো সেই সকল প্রাকৃতিক অধিকার এবং মানবাধিকার যে অংশগুলো কোন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তার দেশের নাগরিক হয়ে ভোগ করে থাকে এবং যেগুলো নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে। অত্র মৌলিক অধিকার পরিপন্থী কোন আইন যদি আইন পরিষদ প্রণয়ন করে সেগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে।
যাহোক, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইসলাম ও মহানবী (সাঃ) যে সব নির্দেশনা দিয়েছেন, তার কয়েকটি সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করা হলো। যথা :

১। জীবনের নিরাপত্তা লাভের অধিকার :
ইসলামে মৌলিক মানবাধিকার হচ্ছে, জীবনের অধিকার বা বেঁচে থাকার অধিকার। আল কুরআন সু¯পষ্টভাবে নির্দেশ করে, “প্রকাশ্যে হোক কিংবা অপ্রকাশ্যে হোক যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে ব্যতীত” (সূরা আন-আম : ১৫১)। “ইসলাম একটি মানুষের জীবন সংহারকে সমগ্র মানবগোষ্ঠির হত্যার সমতুল্য সাব্যস্ত করে” (মায়েদা : ৩২)। আল কুরআন আরো ঘোষণা করে, “আল্লাহ যে প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা কর না” (বনী ইসরাঈল : ৩৩)। অতএব আল কুরআন মানবজীবনের পবিত্রতার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে। এর দ্বারা প্রমাণিত যে, ইসলাম প্রাণের নিরাপত্তা তথা জীবন রক্ষার অধিকারকে মহামূল্যবান মানবাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং মানুষের প্রাণ ও জীবনকে অত্যন্ত সম্মানের ও মূল্যবান বস্তু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসলাম একজন মানুষের জীবন সংহারকে সমগ্র মানবগোষ্ঠির হত্যার সমতুল্য সাব্যস্ত করে জীবনের নিরাপত্তার গুরুত্বের প্রতি যতটা জোর দিয়েছে, তার নজীর পৃথিবীর আর কোন ধর্মীয়, নৈতিক কিংবা আইনশাস্ত্রীয় সাহিত্যের কোথাও মেলে না। আল-কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, কেউ ইচ্ছাকৃত কোন মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার শাস্তি হবে জাহান্নাম।

মহাবিশ্বের মহান নায়ক পৃথিবীর শোষিত নির্যাতিত মজলুম মানুষের মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, “হে লোকসকল। তোমাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্র“র উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের উপর হারাম করা হল।” এ প্রসঙ্গে মহানবীর আরেক হাদীসে উল্লেখ আছে, “কোন মুসলিম ব্যক্তির নিহত হওয়ার তুলনায় সমগ্র পৃথিবীর পতন আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ব্যাপার।” এ প্রসঙ্গে উদাহরণ স্বরূপ ২টি ঘটনার উদ্ধৃতি দেয়া গেল :
(ক) নবীযুগে এক ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেল। কিন্তু হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া গেল না। মহানবী (সাঃ) চরম অসন্তুষ্ট অবস্থায় ভাষণ দিতে গিয়ে বললেন, “হে লোকসকল, ব্যাপার কি! আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকতে মানুষ নিহত হচ্ছে এবং তার হত্যাকারীর পরিচয় মিলছে না। একজন মানুষকে হত্যা করার জন্য আসমান জমিনের সমগ্র সৃষ্টিও যদি একত্র হয়ে যায়, তবুও আল্লাহ এদের সকলকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না” (তাবারানী) ।
(খ) কোন যুদ্ধে একজন স্ত্রীলোক নিহত হয়। মহানবী (সাঃ) তার লাশ দেখে বলেন, “আহ তোমরা একি কাজ করলে? সে তো যোদ্ধাদের মধ্যে শামিল ছিল না। যাও সেনাপতি খালিদকে বলে দাও যে, নারী, শিশু ও দুর্বলদের হত্যা করো না ” (আবু দাউদ, কিতাবুল আমওয়াল, অনু. আ. রহমান তাহের, ইসলামাবাদ, ১৯৯৬ খৃষ্টাব্দ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৮)। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মানুষের জীবনের নিরাপত্তা লাভের অলংঘনীয় অধিকার ঘোষণার বহু পরেই জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ৩নং অনুচ্ছেদে অনুরূপ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২। সম্পত্তির অধিকার :
ইসলামের একটি মৌলিক অধিকার হলো ব্যক্তি মালিকানা বা স¤পদের নিরাপত্তা। এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের নীতিমালা নিুরূপ:
(ক) আল কুরআন: তোমরা অন্যায়ভাবে অন্যের স¤পদ ভোগ কর না (সূরা বাকারাহ : ১৮৮)।
(খ) আল হাদীস: যে ব্যক্তি নিজের স¤পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ (বুখারী)। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেন, তোমাদের জীবন ও ধনস¤পদ কিয়ামত পর্যন্ত পরস্পরের নিকট পবিত্র (বুখারী, মুসলিম)।
(গ) নজীর: কাযী ইউসুফ তাঁর রচিত কিতাবুল খারাজে বলেন, রাষ্ট্রনায়ক কোন প্রতিষ্ঠিত আইনগত অধিকার ছাড়া কোন ব্যক্তির মালিকানা থেকে তার কোন বস্তু নিতে পারবে না।

৩। ধর্মপালন ও বিবেকের অধিকার :
ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকের বিবেক ও ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা রয়েছে। এ ব্যাপারে কুরআন হাদীসের নীতিমালা নিুরূপ:
(ক) আল কুরআন: “দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। সত্য পথ, ভ্রান্ত পথ হতে সু¯পষ্ট হয়ে গেছে” (বাকারা : ২৫৬)। “তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তি করবে ঈমান আনার জন্য” (সূরা ইউনুস : ৯৯)।
(খ) নজীর : হযরত সাদ ইবনে উবাদাহ আনসারীর (রাঃ) ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত খেলাফতের ব্যাপারে আপন মতামতের উপর অবিচল থাকেন। কিন্তু তাঁর কাছে জবরদস্তিমূলক বায়আত না নিয়েছেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) আর না উমর ফারুক (রাঃ)।

৪। জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার :
আল কুরআন মানবজীবনের মৌলিক চাহিদাসমূহকে স্বীকার করে। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে বলা আছে, “এবং তাদের ধন স¤পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক ছিল” (সূরা যারিয়াত : ১৯)। “তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে আহার্য দান করে” (সূরা আদ-দাহর : ৮)।

৫। বাক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার :
বাক স্বাধীনতা বলতে ব্যক্তির চিন্তা, বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের অধিকারকে বুঝায়। মানুষ তার চিন্তা ও বিশ্বাসকে বক্তব্য, গ্রন্থ, পত্রিকা ও লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। বক্তব্য ও লেখনীর স্বাধীনতা আইন দ্বারা সীমিত। ইসলাম মানুষের বাক স্বাধীনতাকে অন্যতম মৌলিক অধিকার বলে মনে করে। কিন্তু কেউ যদি এ স্বাধীনতাকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বা মানুষকে বিচ্যুত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তাহলে ইসলাম তাকে তা করার অনুমতি দেয় না। তাই বলা যায়, ইসলাম সকল মানুষকে তার চিন্তা ও মতামত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। এই মতামতের অধিকার শুধু স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামী রাষ্ট্রের একজন নাগরিক যে কোন বিষয়ে তার মতামত প্রকাশে স্বাধীন এবং স্বাধীনভাবে তা প্রকাশ করতে পারবে। বাকস্বাধীনতার শিক্ষাটি আমরা রাসূল (সাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং অন্যান্য ইমামদের নিকট হতে নিতে পারি। হযরত আলীর সময়ে খারেজীরা তাদের বিশ্বাস প্রচার করতো। হযরত আলী উপদেশ ও যুক্তির মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে আনার চেষ্টা করেছেন। তাদের এ কর্মে অস্ত্রের দ্বারা বাধা প্রদান করেননি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নিজেরাই অস্ত্রধারণ করেছে। যেহেতু খারেজীরা মুয়াবিয়া (রাঃ) ও অন্যদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিল তাই তিনি তাদের প্রথমে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যদি কেউ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সত্যকে জানার পরও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় তাহলে তার পথ রুদ্ধ করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। রাসুল (সাঃ) তাঁর একটি হাদীস দ্বারা এ বিষয়ে সাবধান করেছেন যা নিুরূপ :
আমার পরে কতিপয় স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হবে। যারা তাদের মিথ্যাচারে সহযোগিতা করবে এবং জুলুম ও স্বৈরাচারে মদদ যোগাবে তাদের সাথে আমার কোন স¤পর্ক নেই এবং আমি তাদের নই (নাসাঈ)। খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমর (রাঃ) তাঁদের কৃত ভুলসমূহের সমালোচনা করার জন্যে জনগণকে আহবান করতেন এবং জনসাধারণও নির্দ্বিধায় শাসকদের সমালোচনা করতেন। মত প্রকাশের অধিকার কি পর্যায়ে অবস্থান করছিল তা ন্যায়নিষ্ঠ খলিফাদের যুগের একটি ঘটনা দিয়ে বুঝা যায়। হযরত উমর (রাঃ) সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে জনসম্মুখে খালিদ বিন ওয়ালিদকে বরখাস্তের কারণ বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, “হে উমর, আল্লাহর কসম, তুমি ন্যায়বিচার করনি। তুমি ঐ ব্যক্তিকে বরখাস্ত করেছ যাকে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) নিয়োগ দিয়েছেন। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কর্তৃক উন্নীত তলোয়ারকে তুমি খাপবন্দী করেছ। তুমি বন্ধনকে ছিন্ন করেছ। তুমি তোমার চাচাত ভাইয়ের প্রতি হিংসা প্রদর্শন করেছ।” হযরত উমর (রাঃ) এর চেয়ে বেশি কিছু বলেন নি যে, “তুমি তোমার ভাইয়ের প্রতি আনুগত্যের বশবর্তী হয়ে রুষ্টতা প্রদর্শন করছ।” অন্যত্র আরেক ব্যক্তি ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে হযরত উমর (রাঃ) কে বলতে লাগলেন, “হে উমর আল্লাহকে ভয় কর।” উপস্থিতদের একজন উক্ত ব্যক্তিকে ‘যথেষ্ট হয়েছে’ বলে বাধা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু হযরত উমর (রাঃ) তাকে বাধা দিলেন এবং বললেন, “সে যা বলতে চায় তা তাকে বলতে দাও, তারা যদি প্রতিবাদ না করে তবে তারা নিষ্কর্মা এবং আমরা যদি তাদের কথায় কর্ণপাত না করি তাহলে আমরা নিষ্কর্মা।”

৬। বন্দীদের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা লাভের অধিকার :
“আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি” (সূরা শুরা: ১৫)। ইসলাম কর্তৃক স্বীকৃত বন্দীদের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারটি মানবজাতির জন্যে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ন্যায় প্রতিষ্ঠাই ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি দাও যদি তারা তোমাদের আপনজন হয় তবুও। আল্লাহর হুকুম পালনে যেন তোমাদের মধ্যে কোন ভীতি না থাকে” (মেশকাত, কিতাবুল হুদুদ)। ইসলামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে এতবেশি তাগাদা প্রদান করা হয়েছে যে, এই প্রসংগে আল-কুরআনে ক্ষমতাবানদের উদ্দেশ্যে প্রায় ৬০টি আয়াত বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের বিধান মতে, কাউকে বন্দী করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না মুক্ত আদালতে সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে তার অপরাধ প্রমাণিত হয়। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কাউকে গ্রেফতার করা এবং আদালতের আদেশ ব্যতীত কাউকে বন্দী করা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেয়া ইসলাম অনুমোদন করে না। সাধারণত প্রতিরোধমূলক আটকাদেশ বেআইনি।

৭। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের অধিকার :
ইসলামের বিধান মতে রাষ্ট্রপ্রধানগণ হচ্ছেন আল্লাহতায়ালার খলিফা (প্রতিনিধি)। এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বটি কোন ব্যক্তি, পরিবার বা বিশেষ কোন শ্রেণির উপর অর্পিত হয়নি। এমর্মে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎ কর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসন কর্তৃত্ব দান করবেন” (সূরা নূর : ৫৫)। পবিত্র আল-কুরআনে এটাও সু¯পষ্টভাবে নির্দেশিত হয়েছে যে, খেলাফত (প্রতিনিধিত্ব) আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত একটি সমষ্টিগত দান যাতে প্রত্যেকটি মুসলমানের ক্ষমতা কারো থেকে কম বা বেশি নয়।

৮। গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার :
গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার একটি মূল্যবান অধিকার যা পবিত্র আল কুরআন ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সুন্নাহ দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাৎ নিন্দা না করে” (আল-হুজুরাত : ১২)। আল-কুরআনে উল্লেখিত তাজাচ্ছাহ শব্দের ব্যাপক অর্থ রয়েছে যা বহুবিধ কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। যেমন ব্যক্তিগত চিঠিপত্রাদি পড়া, আড়িপেতে শোনা, ব্যক্তিগত টেলিফোনে আলাপ ধারণ করা, কোন ব্যক্তির আর্থিক, পারিবারিক এবং গোপনীয় বিষয়াদি অনুসন্ধান করা ইত্যাদি। এসকল কর্মকাণ্ড ইসলামে নিষিদ্ধ।

৯। ইজ্জত, সম্মান লাভের অধিকার :
মহানবী (সাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের ইজ্জত ও সম্মানের গ্যারান্টি দিয়েছেন। বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে রাসুল কারীম (সাঃ) জানমালের নিরাপত্তার সাথে সাথে ইজ্জত আব্র“র মর্যাদা রক্ষারও নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল (সাঃ) এর মানবাধিকারের নীতিমালা হচ্ছে : সমাজের প্রত্যেক সদস্য সম্মানিত। তার পদ, স্থান, বিত্ত, বৈভব যাই হোক না কেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সু¯পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছেন, “হে মুমিনগণ, না পুরুষ ব্যক্তি অপর পুরুষ ব্যক্তিদের বিদ্রƒপ করবে, হতে পারে যে সে তাদের তুলনায় ভালো হবে। আর না মহিলারা অন্যান্য মহিলাদের ঠাট্টা করবে, হতে পারে যে সে তাদের তুলনায় উত্তম হবে। নিজেদের মধ্যে একজন অপর জনের ওপর অভিশ¤পাত করো না। না একজন অপরজনকে খারাপ উপনামে ডাকবে। ঈমানের পর ফাসেকী কাজে খ্যাতি লাভ অত্যন্ত খারাপ কথা” (সূরা আল-হুজুরাত: ১১)। কুরআনে আরও বলা আছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা বেশি বেশি ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাক। কেন না কোন কোন ধারণা পাপ হয়ে থাকে। তোমরা দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না। আর তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত (পরনিন্দা) না করে।” পশ্চিমা নিন্দাবাদ ধারণার বিপরীতে ইসলাম নিন্দাবাদকে একটি অপরাধ হিসাবে ঘোষণা করেছে যার দ্বারা নির্বিচারে একজন সম্মানিত লোকও আক্রান্ত হতে পারে বা অপবাদ দ্বারা তার সুনাম ভূলুন্ঠিত হতে পারে এবং তার সুখ্যাতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইসলামী আইন মতে অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করতে এটাই যথেষ্ট যে, অভিযুক্ত কর্তৃক উচ্চারিত শব্দাবলী সাধারণ ধারণা মতে বাদীর সুনাম এবং সম্মানহানির কারণ। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেন, “হে মুখে মুখে ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তিগণ যাদের অন্তরে এখনো ঈমান প্রবেশ করেনি, শোন, মুসলিমদের গোপন অবস্থা খোঁজ করো না। কেননা যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষত্র“টি খুঁজে বেড়াবার কাজে লিপ্ত হবে আল্লাহ নিজেই তার দোষত্র“টি প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন। আর আল্লাহ যার পেছনে লাগেন তাকে তার নিজের ঘরেই লাঞ্ছিত করে ছাড়েন” (সুনানে আবু দাউদ)। ইসলামে মান-সম্মানের মানদণ্ড হিসাবে পেশা-স¤পদ, মেধাকে চিহ্নিত না করে খোদা-ভীরুতাকে সম্মানের মাপকাঠি বলা হয়েছে। রাসুল (সাঃ) বলেন, “কোন মুসলিমের মান-সম্মানের ওপর অকারণ ও অন্যায় আক্রমণ খুব নিকৃষ্ট বাড়াবাড়ি” (সুনানে আবু দাউদ)। ইসলাম সব মানুষকে সমান এবং একই পূর্বপুরুষের বংশধর বলে গণ্য করে। রাসুল (সাঃ) তার বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে ঘোষণা করেন, “আরব-অনারব, সাদা-কালোতে কোন ভেদাভেদ নেই, নেই শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য। তোমাদের মধ্যকার সর্বাধিক মুত্তাকী (যে আল্লাহকে ভয় করে) আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত (আল-হুজ্জরাত)। তাকওয়া ব্যতীত কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।”

১০। যুদ্ধে শত্রু পক্ষের অধিকার :
ইসলাম শুধুমাত্র শান্তির সময়ে নয়, যুদ্ধের সময়েও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। ইসলামের আগমনের পূর্বে সমগ্র বিশ্ব মানবিক ও শালীনতাপূর্ণ যুদ্ধের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। আধুনিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law) যা Geneva Convention, ১৯৪৯ অনুযায়ী যুদ্ধরত সময়েও (ঞরসব ড়ভ ডধৎ) প্রযোজ্য, তার ধারণা ইসলাম থেকেই নেওয়া হয়েছে। ইসলামে যুদ্ধবন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ করা ও তাদের অধিকার বিষয়েও বলেছে। ইসলামের ইতিহাসে এর বহু নজীর রয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনসমূহের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে লক্ষ্য করা যায় যে, এই সম্মেলনগুলো দেড় সহস্রাধিক বছর পূর্বে ইসলাম ঘোষিত মানবাধিকারের সাথে ফলপ্রসু তেমন কিছু যোগ করতে পারেনি।

১১। ইসলামে ভ্রাতৃত্বের মর্যাদা :
ইসলাম বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ প্রদান করে মানবাধিকারকে করেছে সহজলভ্য। এ ব্যাপারে ইসলামে কি বলা হয়েছে তা নিুে তুলে ধরা হল-
আল কুরআন : কুরআন মাজিদে এ স¤পর্কে পরপর দুটো সূরায় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনঃ (ক) সূরা আম্বিয়া-এর ৯২নং আয়তে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় তোমাদের এই ভ্রাতৃত্ব একই ভ্রাতৃত্ব এবং আমি তোমাদের প্রভু এবং পালনকারী। অতএব আমারই এবাদত কর (অন্য করো নয়)।” এবং (খ) সূরা মুমেনুন-এর ৫২নং আয়াতে একই বক্তব্য পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ : নবী (সাঃ) বিদায় ভাষণে এই প্রসঙ্গে বলেন, “কর্মেই সব গুণ নিহিত আছে। বর্ণ ও গোত্রের গৌরবকে স¤পূর্ণরূপে নিন্দনীয় করা হয়েছিল। আরবরা অ-আরবদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। অ-আরবরাও আরবদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। তোমরা সবাই আদমের সন্তান এবং আদমকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। নিশ্চয়ই সকল মুসলমান ভাই-ভাই, যদি একজন কুৎসিত আবেসনীয় ক্রীতদাসও তোমার উপর কর্তৃত্ব দখল করে এবং তোমাকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী পরিচালনা করে তবে তার কথা শুন এবং পালন কর।”

বিশ্ব নবীর বিদায় ভাষণের মতো আর কোথাও ইসলামের যথার্থ প্রাণ স¤পদের এত সুমার্জিত সার-সংকলন হয়নি। এখানেই প্রোথিত হয়েছে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের মহান বীজ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ইস্তাহার পাঠ করেই জাতিসংঘও চেষ্টা করেছিল সকল মানুষ ও সকল জাতির জন্য একটি সাধারণ মানের সাফল্য আরোপ করতে। যাতে এই সনদকে সর্বদাই স্মরণ রেখে প্রতিটি ব্যক্তি এবং সমাজের প্রতিটি অংশ এসব অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধির জন্য উপদেশ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রগতিশীল পদ্ধতির সাহায্যে স্বীকৃতি এবং পালন নিশ্চিত করবে, সদস্য রাষ্ট্রের জনগণ এবং তাদের আওতাধীন অঞ্চলের জনগণ উভয়ের ক্ষেত্রে। সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ১নং অনুচ্ছেদে ভ্রাতৃত্বের তাৎপর্যের কথা বলা হয়েছে এভাবে,“All human beings are born to be free and equal in dignity and rights. They are endowed with reason and conscience and should act towards one another in a spirit of brotherhood”.

১২। মানুষের সমতা বা সমানাধিকার :
ইসলাম মানবাধিকারের ইতিহাসে সমান অধিকার ঘোষণা করে যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা কুরআন-হাদীস ও বিভিন্ন নজীরের আলোকে নিুে তুলে ধরা হল :
(ক) কুরআন : কুরআনুল কারীম মানবগোষ্ঠিকে জন্মগতভাবে সমান মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। যেমন: “হে মানবজাতি, আমরা তোমাদের সকলকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন গোত্র ও বংশে যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে মুত্তাকী” (সূরা হুজুরাত : ১৩)।
(খ) বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ : একই কথা নিুোক্ত বাক্যে বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মহানবী (সাঃ) এর মুখে উচ্চারিত হয়েছে, “আরব-অনারব, সাদা-কালোতে কোন ভেদাভেদ নেই, নেই শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য।”
(গ) হাদীস : “তোমরা সবাই আদমের সন্তান আর আদম মাটির তৈরি” (বুখারী ও মুসলিম)। কুরআন মাজীদ ও রাসুলের এই বাণীসমূহের আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানায় বসবাসকারী সকল মানুষ আইনের চোখে সমান মর্যাদার অধিকারী।
(ঘ) নীতিমালা : নবীযুগ, খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল এবং পরবর্তীকালে আমরা এমন অনেক উদাহরণ এবং নীতিমালার সন্ধান পাই যেখানে মনিব-গোলাম, শাসক-শাসিত, আমীর-ফকির, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে ন্যায়-নীতি ও সমান অধিকারেরর বেলায় কঠোরভাবে সাম্যনীতি অনুসৃত হয়েছে।
(ঙ) নজীর : নবীযুগের একটি সুন্দর নজীর এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একবার অভিজাত কুরায়েশ বংশের এক নারী চুরিতে ধরা পড়ল। তার ঘনিষ্ঠতম আত্মীয় হযরত উসামা (রাঃ) তাকে ক্ষমা করে দেয়ার সুপারিশ করলে, মহানবী (সাঃ) কঠোর ভাষায় বলেন, “হে উসামা। আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করে অনধিকার চর্চা করছ? সাবধান! আর কখনও এরূপ ভুল করবে না।”

অধিকার ও পার¯পরিক বিষয়দির ক্ষেত্রে : রাসুলে কারীম (সাঃ) মুসলিম সৈন্যদের কাতার সোজা করছিলেন। তখন তাঁর অজান্তেই এক সৈনিকের পেটে আঘাত লাগে। সৈন্যটি বললো, “হে রাসুল, আপনি আমার পেটে আঘাত করেছেন।” রাসুল (সাঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর উদরের কাপড় খুলে দিয়ে বলতে লাগলেন, “আমি অত্যন্ত দুঃখিত। অনুরূপ উপায়ে তুমি বদলা নিতে পার।” সৈনিকটি সামনে অগ্রসর হয়ে রাসুলুল্লাহর উদরে চুমো খেয়ে বললো, এটাই আমি চেয়েছিলাম (সুবহানাল্লাহ)।

হযরত আলী যখন রাষ্ট্রপ্রধান তখন তিনি একবার লৌহবর্ম চুরির মামলায় ফরিয়াদী হিসেবে কাজীর আদালতে উপস্থিত হন। আসামী ছিল একজন অমুসলিম। কাজী হযরত আলীকে সম্বোধন করে বলেন, “হে আবু তুরাব, আপনি প্রতিপক্ষের সামনাসামনি বসুন।” কাযী সাহেবের মনে হল এ কথাটি হযরত আলীর কাছে খারাপ লেগেছে। তিনি বলেন, “ওহে আবু তুরাব, সম্ভবত আমার কথা আপনার নিকট অপছন্দীয় হয়েছে। অথচ ইসলামের আইন ও আদালতের সাম্যনীতির আবেদন হচ্ছে ফরিয়াদী ও আসামী একই সমতলে বসা।” হযরত আলী বললেন, “আমার প্রতিপক্ষের সমান স্তরে আমাকে উপবেশন করার নির্দেশ আমার কাছে অপ্রিয় মনে হয়নি বরং অপ্রিয় মনে হয়েছে আমাকে উপনামে আপনার সম্বোধন করাটা। এভাবে আমার প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় আমাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন। এটাতো আমার প্রতিপক্ষের সাথে ¯পষ্ট অন্যায় করলেন” (ইসলাহী, ইসলামী রিয়াযত, পৃ: ৪৫)। এ হচ্ছে ইসলামের বিচার বিভাগীয় এবং সমানাধিকারের সমুজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত। সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা ১৯৪৮ এর ২নং অনুচ্ছেদে এ কথারই প্রতিধ্বনি দেখা যায়।

১৩। দাসদের অধিকার :
গ্রীক ও রোমান সভ্যতা যেখানে বলেছে অন্যসব মানুষকে দাস বানাবার জন্য, সেখানে ইসলাম দাসপ্রথাকে উচ্ছেদ করেছে বহু বছর আগেই। গ্রীক ও রোমান সভ্যতা এবং আজকের পাশ্চাত্য কোন দেশ দখল করলে সেখানকার মানুষকে দাসে পরিণত করেছে এবং তাদের সবকিছুকে ভোগের বস্তু ধরে নিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এর প্রমাণ দুনিয়ার মানুষ দেখেছে। অন্যদিকে ইসলাম, বিজিত দেশের মানুষকে দেখেছে মানুষ হিসেবে। তাদের মৌলিক অধিকারকে পবিত্র জ্ঞান করেছে। ১৮৬৩ সালে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্ব প্রথা বন্ধ হয়। এই বন্ধ করার আইন পাস করতে যে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল, তাতে সোয়া ৬ লাখ মানুষ নিহত হয় অথচ সাড়ে তেরশ বছর আগে ইসলামের নবী দাসপ্রথা বিলুপ্তির সূচনা করেন এবং দাসরা মুক্ত হতে থাকে। ইসলাম এও বিধান করে যে, একজন দাস মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তার খাওয়া, পরা ইত্যাদি সংক্রান্ত অধিকার তার মালিকের সমপর্যায়ে হবে। গ্রীক সভ্যতার ঘোষণা হলো, ‘যারা গ্রীক নয় তারা গ্রীকদের ক্রীতদাস হবে এটাই প্রকৃতির ইচ্ছা।’ আর পৃথিবীর ত্রিশ ভাগের উপরও যাদের অধিকার বর্তায়নি সেই রোমকরাও বিশ্বাস করতো- তারাই পৃথিবীর মালিক, পৃথিবীর সব স¤পদ তাদের জন্যই। তারা নিজস্ব পরিচয় দিত, পৃথিবীর সব মানুষের প্রভু বলে। আর আজকের পাশ্চাত্যের পরম বন্ধু ইহুদীদের ঘোষণা হলো, ‘যখন তোমার পূজনীয় প্রভু কোন নগরকে তোমার অধীন করবে, তখন নগরের প্রতিটি পুরুষকে তলোয়ারের তীক্ষèতায় হনন করো। তোমার শত্র“র সব কিছু তুমি ভোগ করবে।’ অন্যদিকে মুসলমানরা মানবকল্যাণের প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি এবং তাদের কল্যাণ ও মুক্তির আদর্শ ইসলাম। ইসলাম দাসদের কথা বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করেছে। ইসলাম দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে এক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছে। এক্ষেত্রে ইসলামের নীতিমালা নিুরূপ :
(ক) আল হাদীস : মহানবী (সাঃ) দাসপ্রথাকে অপছন্দ করতেন এবং তিনি সু¯পষ্টভাবে বলেছেন, “তিন ধরনের লোক আছে তাদের বিরুদ্ধে আমি শেষ বিচারের দিন অভিযোগ উখাপন করব। একজন, যে মুক্ত মানুষকে দাসে পরিণত করে। একজন, যে তাকে (মুক্ত মানুষকে) বিক্রয় করে এবং অন্যজন সে অর্থ ভোগ করে।”
(খ) নীতিমালা : ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এক্ষেত্রে যে নীতিমালা পাওয়া যায় তা হলো:
(১) ইসলাম দাসদের মুক্ত করার জন্য উৎসাহিত করে দাস সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে।
(২) কিছু কিছু পাপের প্রায়শ্চিত্তের উপায় হিসেবে দাসদের মুক্তি দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে।
(৩) স্বীয় মুক্তচিন্তার মাধ্যমে দাসকে মুক্ত করে দেয়াকে মহাপূণ্যের কাজ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
(গ) নজীর : ইতিহাস এও বলে দেয় যে, (১) রাসুল (সাঃ) একাই ৬৩ জন দাসকে মুক্তি দিয়েছিলেন। (২) হযরত আয়েশা (রাঃ) মুক্তি দিয়েছিলেন ৬৭ জন দাসকে। (৩) হযরত উমর (রাঃ) দিয়েছিলেন ১০০০ জন দাসের মুক্তি। (৪) হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) ত্রিশ হাজার দাস ক্রয় করে তাদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
মোট কথা ইসালাম প্রচারের ৩০/৪০ বৎসরের মধ্যে আরবের মারাÍক দাস সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (টউঐজ) এর অনুচ্ছেদ (৪)-এ দাসপ্রথা নিষিদ্ধের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, “কাউকে অধীনতা বা দাসত্বে আবদ্ধ করা যাবে না। সকল প্রকার ক্রীতদাস প্রথা ও দাসব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা হবে।”

১৪। আইনের দৃষ্টিতে সমতা :
ইসলামী রাষ্ট্র অবশ্যই তার নাগরিকদের আইনের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ সাম্যের অধিকার দেয়। ইসলামী আইনে কোন অবস্থাতেই ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র ভিত্তিতে বিভিন্নতার অবকাশ নেই। যুগে যুগে যে সমস্ত বিষয়াবলীর উদ্ভব ঘটেছে সেই সবের ক্ষেত্রে ইসলামী সুবিচারের বিশ্বজনীন কার্যকারিতা রয়েছে। সুবিচার নীতির একটা জনপ্রিয় প্রবাদবাক্য হচ্ছে, “Equity is equity” – এই ইংরেজী প্রবাদটির সাথেও আমরা পরিচিত। যাহোক এ প্রবাদের একটা সীমিত অর্থ রয়েছে। কিন্তু ইসলামে সমতার অর্থ কোন বিশেষ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর অর্থ ও প্রয়োগ ব্যাপক। এ ক্ষেত্রে কুরআন-হাদীসের নীতিমালা নিুরূপ :
(ক) আল কুরআন : কুরআন মজীদের একটি অলংঘনীয় বিধান হলো মানুষের সাথে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “কোন গোষ্ঠী দলের প্রতি শত্র“তা তোমাদেরকে যেন তাদের প্রতি বে-ইনসাফ করতে উৎসাহিত না করে” (আল-মায়েদা : ৮) ।
(খ) আল হাদীস : হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “মুসলমানদের জীবন এবং রক্ত সমান মহামূল্যবান” (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।
হযরত আলীর বক্তব্য : ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদের ব্যাপারটি খলিফা আলী (রাঃ) নিুরূপ কথায় সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন :
“তারা তোমাদের আশ্রয় গ্রহণ করেছে একমাত্র এই কারণেই তাদের জীবন আমাদের জীবনের ন্যায় এবং তাদের স¤পত্তি বলেই গণ্য হবে” (আবু দাউদ)।
(গ) বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ : বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে নবীজী (সাঃ) সমতার নীতি প্রসঙ্গে বলেন, “চরম উৎকর্ষতা নির্ভর করে একমাত্র কর্মের উপর, বর্ণ বা গোত্রের বড়াই চরমভাবে নিন্দিত।” আর বর্তমান সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৭নং অনুচ্ছেদেও আইনের সমতার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। এভাবে ইসলাম সাম্যনীতির অপূর্ব দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছে।

১৫। অত্যাচারের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার :
ইসলাম নাগরিকদেরকে অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠে প্রতিবাদ করার পূর্ণ অধিকার দিয়েছে। অত্যাচারের সামনে মাথা নত না করার এবং অত্যাচারকে ঠাণ্ডা মাথায় বরদাশত না করাই ইসলামের শিক্ষা। এ স¤পর্কে কুরআন-হাদীসের নীতিমালা নিুরূপ :
(ক) আল কুরআন : অশ্লীলভাষী হওয়া আল্লাহ পছন্দ করেন না। তবে যার উপর জুলুম করা হয়েছে তার কথা স্বতন্ত্র (নিসা : ১৪৮)।
(খ) আল হাদীস : এ স¤পর্কে অনেক প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণিত আছে। যেমন:
(১) “যে ব্যক্তি কোন জালেম শাসকের সামনে ন্যায্য কথা বলে তার জিহাদই সর্বোত্তম।” (২) মানুষ যদি অত্যাচারীর জুলুম দেখেও তাকে প্রতিহত না করে, তাহলে আল্লাহর ব্যাপক শাস্তি তাদের উপরও নাযিল হবে (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
(গ) নজীর : একবার নবীজী (সাঃ) গনিমতের মাল বন্টন করছিলেন। ভিড়ের মধ্যে এক ব্যক্তি সামনে অগ্রসর হয়ে মুখ থুবড়ে তাঁর সম্মুখে পড়ে গেল। তাঁর হাতে তখন একখানা সরু কাষ্ঠখণ্ড ছিল। তিনি তার দ্বারা তাকে মৃদু টোকা দিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে লাঠির অগ্রভাগ তার মুখে লেগে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। তখন তিনি বললেন, “আমার থেকে প্রতিশোধ নাও।” সে আরজ করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি ক্ষমা করে দিলাম। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৫নং অনুচ্ছেদে এই ব্যাপারে বলা হয়েছে।

১৬। ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ :
ইসলামী রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের অপরাধ প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আটক করে তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণè করা যাবে না। কুরআনুল করীম সু¯পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছে যে, আল্লাহ মানুষকে যে স্বাধীনতা দিয়েছেন তা কোন শাসকতো দূরের কথা খোদ আল্লাহর রাসূলও খর্ব করতে পারেন না। যেমন কুরআন-হাদীসে বলা আছে :
(ক) আল কুরআন : কোন মানুষকে আল্লাহ কিতাব, হিকমত ও নবুওয়ত দান করার পর সে বলবে যে, ‘তোমরা আল্লাহকে পরিহার করে আমার বান্দা হয়ে যাও’-এটা সম্ভব নয়। বরং তারা বলবে, তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, যেমন তোমরা কিতাব শিখাতে এবং যেমন তোমরা নিজেরাও পড়তে” (আল ইমরান : ৭৯)।
(খ) আল হাদীস : এ স¤পর্কে মহানবী (সাঃ) এর ভাষ্য হচ্ছে : বাঁচানোর কোন পথ পাওয়া গেলে মানুষকে শাস্তি থেকে মুক্তি দাও (ইবনে মাজাহ)।
(গ) উমরের ভাষ্য : হযরত উমর (রাঃ) সু¯পষ্ট ভাষায় বলেন, ইসলামী নীতিতে অন্যায়ভাবে কোন মানুষকে বন্দী বা গ্রেফতার করা যাবে না।
(ঘ) নজীর : একবার তিনি মসজিদে নববীতে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তখন এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে গ্রেফতারের কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা তার কারণ জানাতে না পারলে মহানবী (সাঃ) তাকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেন।

১৭। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা :
ইসলামে রাষ্ট্রের নাগরিকগণ কেবলমাত্র শাসকদের অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধই করবে না, বরং রাষ্ট্রীয় বিষয়সমূহেরও তারা স্বাধীন মত ব্যক্ত করবে। কুরআন হাদীসের নীতিমালা নিুরূপ:
(ক) আল কুরআন : তারা সৎ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজে বাধা দেয় (আল-ইমরান : ১১০)।
(খ) আল হাদীস : আমার পরে এমন কতিপয় শাসকের আবির্ভাব হবে, যারা তাদের মিথ্যাচারে সহযোগিতা করবে এবং জুলুম ও স্বৈরাচারে মদদ যোগাবে। তাদের সাথে আমার কোন স¤পর্ক নেই এবং আমি তাদের নই (নাসাঈ)।
(গ) নজীর : হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) তাঁর খিলাফতের উদ্বোধনী ভাষণে যথারীতি মতামত প্রকাশের আহবান জানান।

১৮। সংগঠন ও সভা সমাবেশের স্বাধীনতা :
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা যেহেতু কোন বিশেষ ব্যক্তি, দল, বংশ, গোত্র, কিংবা শ্রেণীকে নয় বরং সামষ্টিকভাবে গোটা মুসলিম উম্মাহকে দান করা হয়েছে তাই প্রত্যেক মুসলমানের রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। আল-কুরআনে বলা আছে, মুসলমানরা তাদের যাবতীয় কার্যকলাপ পার®পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে করবে ।
১৯। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার :
ইসলামী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু অমুসলিমরা তাদের সমস্ত সামাজিক অধিকার ভোগ করে থাকে। ইসলামী আইনে অমুসলিমদের জীবন ও স¤পত্তির নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। একইভাবে তাদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে, রয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আমার ধর্ম আমার কাছে।”

২০। নারীর সতীত্বের নিরাপত্তা :
কুরআন মাজীদ থেকে আরো একটি মৌলিক অধিকারের কথা আমরা জানতে পারি। এ স¤পর্কে হাদীসেও বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে। সেটি হলো, নারীদের মান-সম্মানের প্রতি সর্বাবস্থায় অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে। কুরআনের নির্দেশ অনুসারে যে কোন নারীর সাথে ব্যভিচার হারাম। সে নারী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, স্বজাতির হউক বা বিজাতির এবং বন্ধুদেশের হউক বা শক্রদেশের তাতে কিছু আসে যায় না।

২১। পারিতোষিক ও বিনিময় লাভের অধিকার :
ইসলামী রাষ্ট্রে শ্রমিক, চাষী এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে কেউ বিনা পারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে না। তাদের ন্যায়সংগত পারিতোষিক তাদের দিতেই হবে। এই ব্যাপারে বলা আছে :
(ক) আল কুরআন : “তোমার মজুর হিসাবে উত্তম হবে সে, যে হবে শক্তিশালী বিশ্বস্ত” (কাসাস : ২৬)।
(খ) আল হাদিস : শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার মজুরী দিয়ে দাও।
(গ) নজীর : হযরত উমর (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি প্রত্যেক শনিবার মদীনার আশেপাশে তদারকি করতেন এবং কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজে নিয়োজিত দেখলে তার কাজের বোঝা লাঘব করে দিতেন।

২২। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় হেরে গেলে সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার :
পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আল্লাহর বন্ধু বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবাই সমান কৃতিত্ব দেখাতে পারে না। এ প্রতিযোগিতায় যারা হেরে গেলো কোন বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে তারা অর্থনৈতিক জগতে ক্রমশ অধঃপতিত হতে থাকাটাই স্বাভাবিক। আবার সমাজে এমন কিছু লোক থাকে যারা নিজেদের অর্থ-স¤পদ আহরণের যোগ্যতাই রাখে না। অথচ এদেরও থাকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদির চাহিদা। অন্ধ, পাগল, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধী লোকেরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারুণভাবে বঞ্চিত। দরিদ্র বিধবা, দরিদ্র ইয়াতীম আদম সন্তান এবং চির রোগীরাও একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হন। ইসলাম সমাজ নানাভাবে বঞ্চিত অথবা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া মানুষগুলোকে অসহায়ভাবে ছেড়ে দেয় না। বরং এই জীবন-বিধান দুস্থ মানবতার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বিধান করে থাকে। মেহেরবান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “তাদের স¤পদে সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে” (সূরা আয-যারিয়াত : ১৯)। এ উদ্দেশ্যেই ধনীদের স¤পদের উপর যাকাত ফরজ করা হয়েছে। সরকারের কর্তব্য হচ্ছে যাকাত সংগ্রহ করে তা সুষ্ঠুভাবে সমাজের দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে একজন মানুষও অন্ন-বস্ত্র, চিকিৎসাহীন না থাকে।

২৩। অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীদের অধিকার :
ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে তাদের কখনই বাধ্য করবে না ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে। বরং তাদের ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। রাসূল (সাঃ) নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে তাদের ধর্মীয় নিরাপত্তাকে এভাবে নিশ্চয়তা দান করেছেন, “…কোন ধর্মযাজককেই গীর্জা থেকে বহিষ্কার করা হবে না, তাদের কোনরূপ অবমাননা করা হবে না। মুসলিম সৈনিকরা তাদের ভূমি জবরদখল করবে না, তাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে আচরণ করা হবে…।” (বালাযুরী প্রণীত ফতুহুল বুলদান, পৃ. ৬৫)।

অন্যত্র ২য় হিজরী শতাব্দীতে মীনার খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিনামায় তিনি এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হন যে, “আমি এ মর্মে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হচ্ছি, কোন খ্রিস্টান ধর্মযাজককেই বিতাড়িত করা হবে না, তাদের উপাসনালয়ের কোনরূপ ক্ষতিসাধন করা হবে না, তাদের গীর্জা হতে মসজিদের জন্য কোন কিছু আনা হবে না। কোন মুসলমান এরূপ করলে সে আল্লাহর প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করেছে… খ্রিস্টানদের প্রতি কোনরূপ জবরদস্তি করা হবে না। তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা হবে, তাদের ওপর জুলুম করা হতে বিরত থাকা হবে, তারা যেখানেই থাকুক তাদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করা হবে…” (জুরজি যাইদান প্রণীত তারিখে তামাদ্দুনে ইসলাম, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ১২০)। উপরিউক্ত আলোচনা হতে সু¯পষ্ট, ইসলামে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে এ অর্থে যে, ইসলামী রাষ্ট্রে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে জীবন যাপন ও ধর্মীয় আচার পালন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণার ১৮ নম্বর ধারায় বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি ইসলামে স্বীকৃত। তবে এ ধারাতে ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতার বিষয়টিকে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না। যদিও ইসলাম অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টিকে স্বাগত জানায়, কিন্তু কোন মুসলমানের ইসলাম ধর্ম ত্যাগের অনুমতি দেয় না। কারণ ইসলাম এ বিষয়কে ইসলামী সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করার শামিল বলে মনে করে এবং একে ইসলামের বিরুদ্ধে এক রকম বিদ্রোহ বলে মনে করে। বিশেষত যদি কেউ জন্মসূত্রে মুসলমান হয়ে থাকে সে যদি ইসলামকে ত্যাগ করে তবে তার এ কর্মকে ইসলামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে ধরা হয়। কারণ এরূপ ব্যক্তি ইসলামী পরিবেশে ইসলামের মৌল নীতিকে পূর্ণরূপে অনুধাবন করার পরও তাকে বর্জন করেছে। ইসলামী আইনে সে মুরতাদ হিসেবে পরিগণিত এবং মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিতে দণ্ডিত।

২৪। নারী ও ইয়াতীমের অধিকার :
ইসলামপূর্ব যুগে আরব-অনারব জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দুর্বল, ইয়াতীম, বালক-বালিকা ও অবলা নারী চিরকালই জুলুম ও বঞ্চনার শিকার ছিল। তাদের অধিকারকে স্বীকার করা হত না। কোন অধিকার পাওনা হলেও তা আবার তাদের আদায় করার সাধ্য ছিল না। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে চলত সমাজ। ইসলাম সেই অন্যায় ধারা পরিবর্তন করে অনাথ-ইয়াতীম, শিশু ও অবলা নারীদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। তখন কন্যাশিশুকে জীবিত কবর দিত নির্দ্বিধায়। মায়া-মমতার লেশমাত্রও অবশিষ্ট ছিল না। মানবাধিকার সেখানে ছিল ভূলুন্ঠিত। সে যুগকে এ জাতীয় বর্বরতার কারণে নাম দেয়া হয়েছিল আইয়ামে জাহিলিয়াত। সে সময়ে মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর আগমন ছিল বিশ্বমানবতার জন্য একটি বিশেষ করুণা। যার আগমনে পেয়ে গেল অধিকারহারা মানুষগুলো অধিকারের নিশ্চিয়তা, দিশাহারা ও শান্তিহারা মানুষ পেল শান্তি ও সহজ পথের সন্ধান। ভূলুন্ঠিত মানবাধিকার তার মেরুদণ্ড সুদৃঢ় করে দাঁড়াতে আরম্ভ করল। সুপ্রভাতের মনোমুগ্ধকর কোমল বায়ুর ন্যায় তার মহান আদর্শের হৃদয়¯পর্শী শীতল বায়ু সমগ্র পৃথিবীকে পরিণত করে দিল সুখরাজ্যে। ইয়াতীম, বিধবা ও অনাথসহ সকল শ্রেণির মানুষ পেয়ে গেল অধিকারের গ্যারান্টি। অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, অবহেলিত, পদদলিত ও বিতাড়িত সকল মানুষ পেয়ে গেল স্ব স্ব অধিকার এবং জান-মাল ও ইজ্জত-আব্র“র নিরাপত্তার এক অলংঘনীয় প্রতিশ্র“তি। চির অবসান হল বংশ ও মর্যাদার অহমিকার। পার্থক্য রইল না আর সাদা ও কালোর মাঝে, আরবী ও অনারবদের মাঝে। সকলেই হয়ে গেল ভাই-ভাই। আবার পৃথিবীর সকল মতবাদই নারী সমাজকে ভোগের বস্তু হিসেবে জানে এবং ব্যবহার করে থাকে। তারা সমাজে মানুষ বলেই স্বীকৃত ছিল না। একমাত্র বিশ্বনবীর মতাদর্শই নারীকে অতুল্য সম্মানিতা মায়ের মর্যাদা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত করেছে তাদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার। নারীসমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সকল আÍীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত স¤পত্তিতে মীরাসে নারীর স্বত্বাধিকার ইসলামই দান করেছে। সে পিতার স¤পত্তিতে যেমনি অংশ পাবে, তেমনি সে স্বামী ও ছেলের স¤পত্তিতেও ভাগ পাবে।

২৫। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা :
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকার অনন্য বৈশিষ্ট্যের আসনে সমাসীন হয়েছে। এখানে মানুষে-মানুষে কোন পার্থক্য করা হয়নি। শাসনবিভাগ যাতে বিচারবিভাগকে প্রভাবিত করতে না পারে সেজন্য ইসলামে শুরু থেকে শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ আলাদা করার ওপর জোর দিয়েছে। অসামরিক বিচারপতিদের দিয়ে বিচারকাজ স¤পন্ন করা হতো। খলিফা বিচারপতিদের নিয়োগ করতেন কিন্তু তারা বিচারকাজে খলিফা বা শাসনকর্তাদের অধীন হতো না। খলিফা কিংবা শাসনকর্তারা অভিযুক্ত হলে সাধারণ আসামীদের মতই তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হতো। এমন বিচারের দৃষ্টান্তে ইসলামের ইতিহাস ভরপুর। অনেক মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে খলিফারা হেরেছেন এবং এই হেরে যাওয়াকে তারা মাথা পেতে নিয়েছেন।

পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের সাথে এর প্রভেদ :
পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের সাথে ইসলাম প্রদত্ত মানবাধিকারের মৌলিকভাবে এবং বিষয়গতভাবে তেমন প্রভেদ না থাকলেও ধারণাগতভাবে কতিপয় প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়। যেমন:
(ক) উৎপত্তিগতভাবে : পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের উৎপত্তি সাধিত হয়েছে জাতিসংঘ সনদ থেকে কিংবা ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা থেকে। পাশ্চাত্য জগতে দু-তিন শতাব্দী আগেও মানবাধিকারের কোন ধারণার ইতিহাস নেই। কিন্তু ইসলামী মানবাধিকারের এ বিপ্লবী ধারণার সূচনা হয়েছে অনেক আগে অর্থাৎ ১৪ শত বৎসর পূর্বে।
(খ) বাস্তবায়নগতভাবে : ইসলাম কেবলমাত্র মুসলিম এবং অমুসলিমদের জন্য কিছু মৌলিক মানবাধিকারের ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং ঐ সমস্ত অধিকার যদি কেউ লংঘন করে তাহলে বলবৎকরণের ২টি পদ্ধতি রয়েছে। যেমন: (১) একটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় আদালতের মাধ্যমে এবং অপরটি হচ্ছে (২) পরকালে অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। যদি কোন ব্যক্তির অধিকার লংঘিত হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অধিকার বলবৎকরণের জন্য রাষ্ট্রীয় আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। পক্ষান্তরে পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের এ ধরনের তেমন কোন ধারণা পরিলক্ষিত হয়নি। কেননা তার পেছনে কোন শক্তি (অঁঃযড়ৎরঃু) বা কর্তৃত্ব (ঝধহপঃরড়হ) নেই যা তাকে কার্যকর করতে পারে।
(গ) শাশ্বত ও চিরন্তনগতভাবে : ইসলামে যে সমস্ত মৌলিক মানবাধিকারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সেগুলো সার্বজনীন, শাশ্বত ও চিরন্তন। মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে ২টি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে সেগুলো প্রকৃতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় এবং যা আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পরিলক্ষিত হয় না। অন্যদিকে পশ্চিমা মানবাধিকার তাই শাশ্বত ও চিরন্তন নয়।
(ঘ) অনুপম দৃষ্টান্তগতভাবে : ইসলাম কুরআন মাজিদে মানবাধিকারের যে ঘোষণা প্রদান করেছে এবং বিদায় হজ্জ্বের সময় নবী (সাঃ) যে সার সংক্ষেপ পেশ করেছেন তা নবী (সাঃ) স্বয়ং নিজে এবং খোলাফায়ে রাশেদীন এসব অধিকার কার্যতঃ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। পক্ষান্তরে পশ্চিমা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এরূপ কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। তাদের কথায় ও কাজে কোন মিল নেই।
(ঙ) ধর্মীয় অংশ : ১৪ শত বৎসর পূর্বে প্রদত্ত মানবাধিকারগুলো ইসলামের আকিদা, বিশ্বাস, নৈতিকতা ও ধর্মের অংশ হিসেবে অবশ্য পালনীয়। পক্ষান্তরে, পশ্চিমা মানবাধিকারগুলো এরূপ ধর্মীয় অংশ হিসাবে অবশ্য পালনীয় নয়।

ইসলামে মানবাধিকার লংঘনের প্রতিরোধসমূহ :
ইসলাম কর্তৃক প্রদত্ত মানবাধিকার লংঘনের প্রতিরোধসমূহ অদ্বিতীয়। এই প্রতিরোধ বা নিরাপত্তাসমূহ ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ মানবাধিকার নিশ্চিত করে এবং তা অপরিবর্তনীয় ও অসংশোধনীয় সেহেতু ব্যক্তিবিশেষ বা রাষ্ট্র দ্বারা মানবাধিকার লংঘিত হওয়া থেকে ইসলাম চিরন্তন প্রতিরোধ প্রদান করে থাকে। কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, যুক্তিতর্ক ও আইনের ভেল্কি দ্বারা এই অধিকার পরিবর্তনের ক্ষমতা আদালতেরও নেই। এই অধিকারসমূহ রাসুল (সাঃ) এর যুগে এবং তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ খলিফাদের (রাঃ) যুগে কার্যকর হয়েছিল। ইসলামে মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধের আরেকটি পন্থা হলো, যখন কোন রাষ্ট্রে ইসলামী শরীয়াহ কর্তৃক প্রদত্ত মানবাধিকার রক্ষাব্যবস্থার তাগিদ এসেছিল ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) -এর ঘোষণার মাধ্যমে তা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “ততক্ষণ আমার আনুগত্য কর যতক্ষণ আমি আল্লাহ এবং রাসুল (সাঃ) -এর আনুগত্য করবো।” মানবাধিকারের অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হচ্ছে রাষ্ট্র ও নাগরিকগণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ঐক্য। রাষ্ট্র ও তার প্রজাগণ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। উভয়ের অভিন্ন লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো। এবং একটি আদর্শিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ।

পশ্চিমা মানবাধিকার ধারার উন্নয়ন :
১২১৫ সালে সংকলিত ম্যাগনাকার্টাকে মানবাধিকারের সর্বপ্রথম দলিল হিসেবে দাবী করা হয়। মূলতঃ ম্যাগানাকার্টা ছিল একটি সাধারণ চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাষ্ট্র এবং সম্ভ্রান্ত শ্রেণির মধ্যকার অধিকার রক্ষার্থে। এটাতে সমগ্র মানবজাতির অধিকার রক্ষার স¤পৃক্ততা ছিল না। অনেক দিন পরে একে মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। ১৩৫৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একে অনুমোদনের মাধ্যমে একটি আইন প্রণয়ন করে। উল্লেখিত আইনের প্রয়োগ ব্যতীত কাউকে তার জীবন, স্বাধীনতা অথবা ভূমি হতে বঞ্চিত করা যাবে না। যাহোক, চতুর্দশ হতে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা মাত্রাতিরিক্ত ভাবে ম্যাকিয়াভ্যালি ও লুথারের মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিল। যার ফলশ্র“তিতে রাষ্ট্র সাধারণ জনগণের উপর চরম ক্ষমতার অধিকার চর্চার সুযোগ পেয়ে যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের বলগাহীন ক্ষমতা প্রতিরোধকল্পে সাধারণ অধিকার ধারণার সূত্রপাত হয়। রুশো ও অন্যান্য দার্শনিক কর্তৃক প্রভাবিত এই আন্দোলনের ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংবিধানে বর্ণিত মানবাধিকারসমূহ একটি সামগ্রিক রূপলাভ করে এবং ঘোষণা চূড়ান্তভাবে ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার রূপে স্বীকৃতি পায়। এই সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ছাড়াও জাতিসংঘ বহুবিধ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে যথা : গণহত্যার শাস্তি ও এর প্রতিরোধ বিষয়ক সম্মেলন ১৯৪৮, নির্যাতন প্রতিরোধব্যবস্থা সংক্রান্ত ঘোষণা ১৯৭৫, শরণার্থীর মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলন ১৯৫১, উদ্বাস্তু বিষয়ক সম্মেলন ১৯৫৪, নারীদের রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক সম্মেলন ১৯৫৩, সকল প্রকার অসহিঞ্চুতা ও ধর্মীয় বৈষম্য দূরীকরণ ঘোষণা ১৯৮১, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ১৯৬৬, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক সম্মেলন ১৯৬৬, সকল প্রকার বর্ণ বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ১৯৬৬ ইত্যাদি। কিন্তু এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে লক্ষ্য করা যায় যে, এই সম্মেলনগুলো দেড় সহস্রাধিক বছর পূর্বে ইসলাম ঘোষিত মানবাধিকারের সাথে ফলপ্রসু তেমন কিছু যোগ করতে পারেনি। অধিকন্তু এই সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা, চুক্তি ও সম্মেলনগুলো হল কাগুজে বিষয়। এগুলো নির্দেশনামূলক হওয়ায় কোনটি কার্যকর হয়নি। যেমন সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সূচনা বাণী নিুরূপ :
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মানবিক অধিকারের এই সার্বজনীন ঘোষণাকে সকল গোষ্ঠির ও সকল জাতির জন্য অভীষ্ট সাধারণ মান হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করছে। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিটি অংশ এই ঘোষণাকে সর্বদা মনে রেখে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এসব অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের জনসাধারণ এবং স্বায়ত্ত্বশাসিত ভূ-খণ্ডের জনগোষ্ঠির মধ্যে এসব অধিকার ও স্বাধীনতার সার্বজনীন ও কার্যকর স্বীকৃতি প্রদান ও বাস্তবায়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাবে। এই সার্বজনীন ঘোষণার প্রকৃতি থেকে এটা সু¯পষ্ট যে একটি রাষ্ট্র এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করার পরও তা মানতে বা বর্জন করতে স¤পূর্ণ স্বাধীন। আর উল্লেখিত ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের অক্ষমতা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, এই সমস্ত সংস্থাসমূহ বাস্তব মূল্যায়ন থেকে আলংকারিক মূল্যায়ন বেশি করে থাকে। এছাড়াও এটা সর্বজন বিদিত যে, যেসব পশ্চিমা দেশ এই অধিকার অর্জনে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারাও ব্যর্থতার সম্মুখীন হচ্ছে। তারা ব্যর্থ হচ্ছে প্রথমত তাদের দ্বিমুখী নীতির কারণে। নিজ দেশের জন্যে এক রকম নীতি এবং দরিদ্র দেশগুলোর জন্যে আরেক নীতি। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব নৈতিকতার অভাব। তাদের নিজেদেরই নৈতিক কোন মূল্যবোধ নেই যা এ জাতীয় অধিকার আইনানুগভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১নং ধারামতে, সকল মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং অধিকার ও মর্যাদার দিক হতে সমান। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে এই বাস্তবতাকে মেনে নেয়া প্রায় অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে যে, অধিকার ও মর্যাদার দিক হতে সকল মানুষ সমান। একজন শ্বেতাঙ্গ কোনক্রমেই একজন কৃষ্ণাঙ্গকে তার সমান ভাবতে নারাজ। ঐতিহাসিকদের মতে, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আধুনিক পশ্চিমা বিশ্ব তার সকল বৈষয়িক উন্নতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দ্বারা শত বৎসরের চেষ্টা সত্ত্বেও যে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তা অতি অল্প সময়ে আরবের মরু প্রান্তরে অর্জিত হয়েছিল এবং এই প্রাপ্তি খুব সহজেই ও কার্যকর উপায়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।

উপসংহার :
ইসলাম দুনিয়াবাসীকে মানবাধিকারের উৎকৃষ্ট উদাহরণ দিয়ে গেছে। মহানবী (সাঃ) এর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মানবাধিকার স¤পর্কিত এই সুদীর্ঘ আলোচনায় এ কথাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, ইসলাম সর্বাগ্রে মানবাধিকারের সৌরভ উপহার দিয়েছে দুনিয়াবাসীকে। পশ্চিমা বিশ্বের মত কেবল উপহার পেশ করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং বাস্তবায়ন করে বাস্তবে তার চিত্রায়ন করে গেছে। পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারগুলো কল্পনাপ্রসূত কোন শিল্পীর তুলির নৈপুণ্য বৈ আর কিছু নয়। কিন্তু ইসলামী মানবাধিকার একটি বাস্তব ও জীবন্ত ছবি, একটি ব্লুপ্রিন্ট। বিশেষ করে এক্ষেত্রে বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ প্রণিধানযোগ্য। কেননা, দেড় হাজার বৎসর পূর্বে মহানবী (সাঃ) মানবাধিকারের যে সার-নির্যাস পেশ করেছেন তা বিংশ শতাব্দীতে বসে ভাবতে বড়ই বিস্ময় লাগে। বিশ্বের আনাচে-কানাচে, আজ মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত হচ্ছে, অধিকারহারা মানুষের মুখ থুবড়ে পড়েছে, বিশ্বের রাজপথগুলো রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। কিন্তু কেন? আজ জাতিসংঘ (পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন) যা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। তাহলে কি জাতিসংঘ ব্যর্থ? মানবাধিকারের বড় বড় বুলিও কি ব্যর্থ? আসুন ইসলামে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মহান আন্দোলনে নিজেদের নিবেদিত করি। কেননা মহানবী বিশ্বনবী (সাঃ) এর আদর্শ বাস্তবায়ন ছাড়া উত্তপ্ত, অশান্ত এই পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

প্রধান সম্পাদক : ইঞ্জিনিয়র এ.কে,এম. কামরুজ্জামান, সম্পাদক : ইঞ্জিঃ শারমিন সুলতানা রূমা, বার্তা সম্পাদক : নবাব সালেহ আহমেদ, বিজ্ঞাপন সম্পাদক : মোজাম্মেল হক নাঈম, প্যানেল এডিটর : ড. মোঃ মোজাহেদুল ইসলাম মুজাহিদ, আব্দুল শামীম সেরনিয়াবাত, মোঃ আনোয়ার হোসেন, রাজিয়া সুলতানা স্মৃতি, আঞ্জমান আরা তন্নী, আফরোজা সুলতানা প্রধান উপদেষ্ঠা : ড. মোঃ জিয়াউর রহমান, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। যোগাযোগ : আকমল ম্যানশন, ৮৯/১, কাকরাইল (দ্বিতীয় তলা), রমনা, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৮৮ ০২ ৮৩৩৩৪১৬, সেল : ০১৯৭৩ ৩৭৭ ৭৭৯, ই-মেইল : tigernewsbd@gmail.com (News) ; chrm11bd@gmail.com (Admin)

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful