Templates by BIGtheme NET
ব্রেকিং নিউজ ❯
Home / সুন্দরবন সংবাদ / রামপাল কয়লা প্রকল্প ও তথ্যবিভ্রান্তি :: ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম

রামপাল কয়লা প্রকল্প ও তথ্যবিভ্রান্তি :: ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম

ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম

দেশটা আমাদের সকলের। তাই দেশের প্রতি সকলের কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। সরকার দেশ পরিচালনায় মূখ্য ভূমিকা পালন করলেও দেশের নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এটি কোন রাজনৈতিক দলের দেশ পরিচালনার জন্য পাঁচ-দশ বছরের ক্ষমতার সাথে সর্ম্পক যুক্ত বিষয় নয়। তবে রাজনীতিবীদদের ভাল মন্দ কাজের সাথে দেশের উন্নয়ন ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব জড়িত। দেশে বসবাসের পরিবেশ এবং উন্নয়ন নিয়ে সচেতন নাগরিকগণ যে মতামত দিবে সরকার তা বিবেচনায় নিয়ে সঠিক কাজটি করবে সেটাই সবার প্রত্যাশা। সত্যিকারের উন্নয়ন কখনো মানুষকে হুমকির মূখে ফেলে হতে পারে না। কিন্তু রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে নিয়ে দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। পক্ষে কথা বলছেন শুধুমাত্র প্রকল্পের সাথে জড়িত সুবিধাভোগী, সরকার দলীয় নেতা বা আজ্ঞাভাজন ব্যক্তিবর্গ। পক্ষান্তরে ইউনেস্কো, কয়লা বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজের সদস্য, সচেতন নাগরিক সমাজ, রাজনীতিক, দেশী-বিদেশী পরিবেশকর্মী, মানবাধিকারকর্মী সবাই বলছেন রামপাল কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হুমকির মুখে পড়বে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ এর বিপক্ষে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। সরকার রামপাল বিরোধীদের যৌক্তিক মতামত অগ্রাহ্য করে রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নে অনঢ় ও একগুয়ে মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করে জনমত তৈরী এবং সরকার দলীয় স্থানীয় রাজনীতিকদের ব্যবহার করে যে কোন উপায়ে এটা বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।

Rampal Gazi

জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) এর একটি প্রতিনিধি দল গত বছর মার্চ মাসে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও সুন্দরবন পরিদর্শন করে। বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া বিশেষজ্ঞরা তাদের প্রতিবেদনে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য বাংলাদেশ সরকারকে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার রামপাল প্রকল্পে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এতে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হওয়ার আশাঙ্কা নেই, এটা ইউনেস্কো ও বিশ্ব ঐতিহ্য কর্মকর্তাদের জানানোর জন্য গত অক্টোবর মাসে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাঠায় ইউনেস্কোর সদর দপ্তর প্যারিসে। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সফরের পরও ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। ২০১৭ সালের ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪১তম সভায় সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যেও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হবে। ইউনেস্কো রামপাল নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরী করেছে সেটা জাতিসংঘ মহাসচিব অনুমোদন করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিবের অনুমোদনের পর সরকার যদি রামপাল প্রকল্প থেকে সরে না আসে তবে আগামীতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলের (জিসিএফ) নীতিনির্ধারণী ফোরামের স্থায়ী সদস্য হারিয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ এ তিন বছরের জন্য জিসিএফ সভার স্থায়ী সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দায়িত্ব শেষ করার দুই বছর আগেই স্থায়ী সদস্য পদ থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন করে স্থায়ী সদস্য পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আফ্রিকার দেশ মালাওয়িকে। এরই মধ্যে এ তহবিল থেকে বাংলাদেশের জন্য আট কোটি ডলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং আরো আট কোটি ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।স্থায়ী সদস্য পদ হারানোয় ভবিষ্যতে এ তহবিল থেকে টাকা পাওয়া বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা (সূত্রঃ কালের কন্ঠ, ১৭ ডিসে¤^র ২০১৬)।

প্রধানমন্ত্রী ২৮ জানুয়ারী ২০১৭ চট্রগ্রামে আইইবি এর অনুষ্ঠানে বলেন, রামপালে যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে সেটি “আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল” পাওয়ার প্লান্ট। পৃথিবীর সব থেকে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমরা তৈরী করছি। প্রধানমন্ত্রী ২৭ আগষ্ট ২০১৬ সংবাদ সম্মেলনেও রামপালে “আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল” পাওয়ার প্লান্টের কথা বলেছিলেন। দুঃখ্যজনকভাবে বলতে হচ্ছে প্রধামন্ত্রীকে সঠিক তথ্য থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। এখানে দু’টো বিষয় বলা খুবই জরুরী প্রথমতঃ সর্বশেষ আধুনিক কয়লা বিদ্যুৎ প্রযুক্তি হচ্ছে “অ্যাডভান্সড আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল” দ্বিতীয়ত ঃ রামপাল প্রকল্প তৈরী হচ্ছে “সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে”। রামপাল প্রকল্পের প্রযুক্তির বিষয় বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী লিঃ (বিআইপিসিএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভারতীয় নাগরিক উজ্জল কান্তি ভট্টাচার্য ২৭ অক্টোবর ২০১৬ টেলিফোনে দৈনিক কালের কন্ঠের প্রতিনিধি কে বলেন, ”আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলে কোনো প্রযুক্তি পৃথিবীতে নেই। মূলত সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির আধুনিক সংস্করণকে কেউ কেউ আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলে থাকে”। তাহলে আপনারা কেন আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের কথা এত দিন বলে এসেছেন? এ প্রশ্নের জবাবে উজ্জল কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ”আপনাদের এখানে এত পন্ডিত, এটি জানতাম না। রামপাল বিরোধীতাকারীরা না জেনেই এর বিরোধীতা করেছে। আমাদের এত নাটক করার দরকার নেই। আপনাদের এখানে নাটকবাজি হয় বলে প্রথমে বলেছিলাম আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হবে”। আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বিশ্বে নেই বলে বিআইপিসিএলের এমডি দাবি করলেও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাতা ভারত হেভি ইলেকট্রিক লিমিটেড (ভেল) এনটিপিসির সঙ্গে যৌথভাবে একটি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে চুক্তি করেছে। গত ১৬ আগষ্ট ভেলের ওয়েবসাইটে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত ১০ আগষ্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অ্যাডভান্সড আল্ট্র্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি নিযে গবেষণার জন্য ভেলকে ২৩০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। অ্যাডভান্সড আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা গেলে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির তুলনায় ৫ শতাংশ কয়লা কম পুড়িয়ে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। তথ্য গোপন বা প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে রামপাল দরপত্রের বি-১, তাপীয় জেনারেটর কেন্দ্র চ্যাপ্টারের বি-১-১ পাতায় পাওয়া গেছে কেন্দ্রটি কোন প্রযুক্তির হবে। দরপত্রের ওই অংশে বলা হয়েছে জেনারেটরটি হতে হবে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির। দরপত্রে যখন উল্লেখ রয়েছে কেন্দ্রটি হবে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির, সেখানে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ নেই। (সূত্র: কালের কন্ঠ ২৯ অক্টোবর ২০১৬)। ২০ ফেরুয়ারী ২০০৯ ভেল তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৬০টি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু আছে তারমধ্যে ভারতেও ৯ টি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ১২ এপ্রিল ২০১৩ রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদুৎ কেন্দ্রের “পরিবেশগত প্রভাব নিরুপন (ইআইএ)” বিষয় জনমত পর্যালোচনা সভার আয়োজন করে পিডিবি। সেখানেও সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযক্তির বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। সম্ভবত সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনকে প্রভাবিত করার জন্য প্রকল্পকে আল্টা সুপার রূপ দেওয়া হয়েছে। বিআইপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জল কান্তি ভট্টাচার্যের উপরোক্ত বিরূপ মন্তবের পর সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি তার প্রতিবাদ করে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সরকার প্রযুক্তি বা উজ্জল বাবুর বক্তব্য নিয়ে আর কোন ব্যাখা দেয়নি।

Farid-099

২৮ জানুয়ারী ২০১৭ চট্রগ্রামে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ বিরোধীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “মানুষের জন্য তাদের কোন দুঃখ নেই, কোন কান্না নেই, মানুষের ভালমন্দ দেখার দরকার নেই, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য তারা কাঁদছেন” ইত্যাদি…। অথচ উনিই আবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ বাঘ রক্ষা সম্মেলনে বলেছিলেন, “বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে। আর সুন্দরবন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। আসুন আমরা সবাই মিলে বাঘ বাঁচাই প্রকৃতি বাঁচাই”। আমরা তো উনার সেই আহব্বানে সাড়া দিয়ে সুন্দরবন বাঁচানোর জন্য রামপাল বিরোধীতা করছি। উনি আবারও বড়পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে চট্রগ্রামে কথা বলেছেন। উত্তরে আমরা বলতে চাই, সেখানে সুন্দরবন নেই। ১২৫ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্পে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ২৫০ মেগাওয়াট আর ১৩২০ মেগাওয়াট এক হিসাব নয়। সেখানে পানির সমস্যা হচ্ছে। গত ৫ সেপ্ট¤^র ২০১৬ কালের কন্ঠ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে বড়পুকুরিয়ার ৮ গ্রামে পানির জন্য হাহাকার, ১৩০ ফুট গভীরেও পানি মিলছে না। সর্বোপরি বড়পুকুরিয়ার কয়লা খুব উন্নত মানের যেটা রামপালের সাথে তুলনা করা যায় না, কারণ রামপাল প্রকল্পের জন্য এখনও কোন দেশের সাথে কয়লা আমদানী চুক্তি করা হয় নাই। সুতরাং রামপালে ভারতের নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার করা হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই! ইতিমধ্যে ভারতীয় কয়লা সচিব অনীল ¯রূপ গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বলেছে, ”আমাদের ৮ কোটি টনের ও বেশী কয়লা মজুত রয়েছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশের সাথে ১৩২০ মেগা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চুক্তি হয়েছে, তাই কোল ইন্ডিয়া লিঃ আলোচনা করছে আমরা যদি বাংলাদেশে কিছু কয়লা রপ্তানি করতে পারি। আমরা কয়লা এখন আর কোথায় জমা করবো”?

বিশ্ব যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক শক্তি বা নবায়ন যোগ্য জ¦ালানী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তখন আমরা নতুন করে শানিত হচ্ছি কয়লার মত দূষিত জ্বালানী ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে। সরকার দাবী করছে দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। সেটা বলতে গেলে অর্জন হয়েছে কয়লা বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেই। তাহলে প্রশ্ন আসছে আমাদের প্রজন্মকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে নোংরা জ্বালানী কয়লা নিয়ে এতটা আগ্রহ কেন? বিষয়টা নিয়ে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ভেবে দেখার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। দীর্ঘকাল থেকে আমরা ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছি। যেহেতু তেলের দাম আমাদের ক্রয় সীমার মধ্যে আছে তাহলে আপাতত আমরা তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানীর সক্ষমতা বাড়ানো চেষ্টা করতে পারি।

পরিবেশ দূষণ থেকে বাঁচার জন্য বেলজিয়াম ৩০ মার্চ ২০১৬ তাদের শেষ কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করে কয়লাকে বিদায় দিয়েছে। ফ্রান্স ২০২৩, ইংল্যান্ড ২০২৫ ও নেদারল্যান্ড ২০৩০ সালের মধ্যে সমস্ত কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন (এনআইএ) ১৪ জানুয়ারী ২০১৭ কয়লা ভিত্তিক ১০৩টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের আদেশ জারি করেছে। ১১টি প্রদেশে অবস্থিত এই প্রকল্প গুলো ১০০ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমালে ও দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য বিকল্প পথে হাটছে চীন। ২০২০ সালের মধ্যে ১৩০ গিগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন বাতাস এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যেগ নিয়েছে দেশটি (সূত্র: প্রথম আলো ২৭ জানুয়ারী ২০১৭)। কয়লা দূষণ থেকে মুক্তি পেতে ভারত নিজেই এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানীর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দূষণের জন্য গত বছর জুন মাসের প্রথম সপ্তায় ভারত ৪টি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প (১৬,০০০ মেগাওয়াট) বাতিল করেছে এবং ২০২২ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ¦ালানী থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি ভারতের আদানি গ্রæপের প্রতিষ্ঠান ’আদানি গ্রীন এনার্জি লিঃ’ তামিলনাড়– রাজ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৬ শত ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে সংস্থাটির ধারণা। আদানি গ্রæপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি মতে পরিবেশ বান্ধব জ্বালানী ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতবাসী যেমন উপকৃত হবেন তেমনি বিশ্বের জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব রোধে অনুকরণীয় হবে। এখানে উল্লেখ্য নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতাগ্রহণের পর এই বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। সৌর জ্বালানী উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ২০২২ সালের মধ্যে ১শত গিগাওয়াটে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। শ্রীলঙ্কা ভারতের এনটিপিসি সাথে ২০০৬ সালে ৫০০ ইউনিটের দুইটি অর্থাৎ ১০০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি করেছিলো। ১৬ সেপ্টে¤^র ২০১৬ শ্রীলঙ্কার সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রী পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ ও আপত্তি আমলে নিয়ে তা বাতিল করেন। এই ভাবে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে সবাই কয়লা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

sundarban111

সর্বোপরি রামপাল হলো প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম ঝুকিপূর্ণ দেশ। ১৮৮১-১৯৯০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে ঘুর্ণিঝড়ের আঘাতে যত মানুষ মারা গেছে তার ৪৯% বাংলাদেশে। ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘুর্ণিঝড়ে যথাক্রমে প্রায় ৫ লাখ এবং ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায়। (সূত্র: বাংলাদেশ রিসার্স পাবলিকেশনস জার্নাল, আইএসএন: ১৯৯৮-২০০৩, ভলিউম: ৪, ইসু: ৩, পাতা ২২০)। ২০১৩ সালের ১৯ জুন বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০০৭ সালে ভয়াবহ সিডরের আঘাতে প্রায় ৩৫ লাখ বাড়িঘরে পানি উঠে গিয়েছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের কমপক্ষে ৫০টি ভয়াবহ ঝড় হতে পারে এবং প্রায় ৯৭ লাখ মানুষের বাড়িঘর ও কৃষিজমি তিন মিটারের বেশী পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। । প্রাকৃতিক দূর্যোগে সুন্দরবন আমাদের মায়ের মত আগলে রাখে। সিডর বা আইলারমত ঝড় বা জলোচ্ছ¦াস হলে পশুর নদীর জোয়ার-ভাটার ¯্রােতে হাজার হাজার টন ছাই বা কয়লা বর্জ্য সুন্দরবন সহ উপকুলের সব জনপদে ছড়িয়ে পড়বে। এ ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতে ছাইপুকুর বা কয়লা গুদাম রক্ষা করবে কে?

বিশেষজ্ঞদের মতে কয়লা পোড়ালে বায়বীয়, কঠিন ও তরল এই তিন ধরণের দূষণ নির্গত হয়। কার্বনডাই অক্সসাইড, নাইট্রোজেন অক্সসাইড এবং সালফার ডাই অক্সসাইডসহ বিভিন্ন ধরণের বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। সৃষ্টি ছাইয়ের ভেতরে পারদ, সিসা ও আর্সেনিক জাতীয়ভারী ধাতব থেকে যায় যা মাটি ও পানিকে দুষিত করবে। দুঃখ্যজনক বিষয় হচ্ছে, রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে ছাড়পত্রদাতা প্রতিষ্ঠান হলো সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রলায়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ’সিইজিআইএস’। এদের জরিপ-গবেষণা অতঃপর এধরনের সংবেদনশীল স্থানে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিমার্ণের ছাড়পত্র সরকারের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে। আমরা সরকারকে বিনীত অনুরোধ করবো রামপাল বিরোধীদের তথ্য যাচাই করার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) পুনরায় করুন এবং প্রকৃত লাভ-লোকসানের চিত্র দেখুন। ভারত বা বাংলাদেশ সরকারের অধীনস্ত কোন প্রতিষ্ঠান তাদের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে না। অথবা গনভোট দিয়ে দেশের মানুষের মতামত নিন।

পরিশেষে সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, বাংলাদেশের ফুসফুস খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, প্রকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রামপাল কয়লা প্রকল্প বাতিল করুন অথবা সুন্দরবন থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিন।

লেখক: চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful